ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আর এই দিকনির্দেশনা মূল ভিত্তিই হলো জ্ঞান বা শিক্ষা। মানব সভ্যতার বিকাশ, নৈতিক চরিত্রের উন্নয়ন, ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির জন্য ইসলাম শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। আর এই জ্ঞানার্জনের অধিকার কেবল পুরুষের একচেটিয়া নয়, বরং নারীর জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।
ইসলাম ও শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য
সম্পর্ক
ইসলামে শিক্ষার অবস্থান ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি ঈমানের সাথে সরাসরি যুক্ত। অন্ধকার থেকে আলোতে আসার একমাত্র মাধ্যম হলো শিক্ষা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে শিক্ষা বিস্তারের জন্য স্থাপিত Ashab al-Suffah Education System তারই প্রমাণ বহন করে।
প্রথম ওহীতে শিক্ষার ঘোষণা
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর হেরা
গুহায় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যে প্রথম বাণী
অবতীর্ণ হয়েছিল, তা কোনো যুদ্ধ,
রাজনীতি বা অর্থনীতির বিষয়ে
ছিল না। সেটি ছিল পড়ার নির্দেশ।
"পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আলাক, আয়াত: ১)
এই প্রথম বাণীই প্রমাণ করে যে, ইসলামের যাত্রা শুরু হয়েছে শিক্ষার আলো ছড়ানোর মাধ্যমে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে,
পড়তে জানা এবং জ্ঞান অর্জন করাই ইসলামের প্রথম নির্দেশ।
ইলম বা জ্ঞানের মর্যাদা
পবিত্র কুরআনে জ্ঞানকে আলোর সাথে এবং মূর্খতাকে অন্ধকারের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ইসলামে অন্ধকারের ওপর আলোকে যেভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি একজন জ্ঞানহীন মানুষের ওপর একজন জ্ঞানীর মর্যাদাকে উচ্চাসীন করা হয়েছে।
ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব কেন অপরিসীম?
ইসলাম শিক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য
দিয়েছে, এটা আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। নিচে এর প্রধান কারণগুলো
বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. ইসলামে জ্ঞান অর্জন ফরয
ইসলামে কিছু ইবাদত রয়েছে যা সবার জন্য
ফরয নয় -যেমন: যাকাত বা হজ্ব ধনী-দরিদ্রভেদে ভিন্ন হয়। কিন্তু শিক্ষা অর্জনের বিষয়টি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের জন্য ফরয করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “যারা
জানে বা জ্ঞানী তারা এবং যারা জানে না তথা অজ্ঞ তারা কি সমান?” (সূরা আয-যুমার, আয়াত- ৯)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
"জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২২৪)
২. স্রষ্টাকে চেনার একমাত্র মাধ্যম
সঠিক শিক্ষা বা দ্বীনি জ্ঞান
ছাড়া মহান আল্লাহকে সঠিকভাবে চেনা এবং তাঁর ইবাদত করা সম্ভব নয়। সৃষ্টিজগত নিয়ে গবেষণা এবং কুরআনের গভীর জ্ঞান মানুষকে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী করে তোলে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী
তারাই কেবল তাকে ভয় করে।" সূরা
ফাতির, আয়াত: ২৮
৩. মানব চরিত্রের নৈতিক উন্নয়ন
শিক্ষা মানুষকে ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখায়। ইসলাম এমন এক শিক্ষার কথা
বলে যা মানুষের ভেতর
তাকওয়া (আল্লাহভীতি) এবং নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে। অহংকার, হিংসা ও লোভ পরিহার
করে বিনয়ী হতে শেখায় শিক্ষা।
শিক্ষার শ্রেণীবিভাগ: ইসলাম কী ধরনের শিক্ষা
সমর্থন করে?
সাধারণত আমরা শিক্ষাকে ধর্মীয় ও পার্থিব—এই
দুই ভাগে ভাগ করি। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে উপকারী যেকোনো শিক্ষাই প্রশংসনীয়।
দ্বীনি শিক্ষা বা ধর্মীয় জ্ঞান
এটি হলো ফরযে আইন বা মৌলিক জ্ঞান।
একজন মুসলিম হিসেবে দৈনন্দিন জীবনে চলার জন্য, হালাল-হারাম চেনার জন্য এবং ইবাদত সঠিকভাবে আদায়ের জন্য যতটুকু জ্ঞান প্রয়োজন, তা অর্জন করা
বাধ্যতামূলক।
পার্থিব বা আধুনিক বিজ্ঞান
শিক্ষা
ইসলাম বিজ্ঞান, চিকিৎসা, গণিত বা প্রযুক্তির শিক্ষাকে
খাটো করে দেখে না। বরং মানব কল্যাণে নিয়োজিত যেকোনো বিদ্যা অর্জন করাকে ইসলামে 'ফরযে কিফায়া' বা সমষ্টিগত দায়িত্ব
বলা হয়েছে।
ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞান" সম্পর্কে জানতে এই আর্টিকেলটি পড়ে নিন।
সমাজ বিনির্মাণে এবং সভ্যতার বিকাশে শিক্ষা
একটি আদর্শ সমাজ ও জাতি গঠনে
শিক্ষার বিকল্প নেই। ইসলাম সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
কুসংস্কার ও জাহেলিয়াত দূরীকরণ
ইসলামের আগমনের পূর্বের সময়কে 'আইয়ামে জাহেলিয়াত' বা মূর্খতার যুগ
বলা হতো। শিক্ষার আলো দিয়েই রাসূল (সা.) সেই বর্বর সমাজকে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে সভ্য ও শ্রেষ্ঠ সমাজে
রূপান্তর করেছিলেন।
যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির শর্ত হিসেবে শিক্ষা
বদরের যুদ্ধে ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য নজির
দেখা যায়। শিক্ষিত অমুসলিম যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, তারা মদীনার ১০ জন শিশুকে
অক্ষরজ্ঞান বা শিক্ষা দান
করবে। এটি শিক্ষার প্রতি ইসলামের গুরুত্বের এক ঐতিহাসিক প্রমাণ।
জ্ঞানী ও শিক্ষকের মর্যাদা
ইসলাম শুধুমাত্র শিক্ষার্থীর প্রশংসা করেনি, বরং যারা জ্ঞান বিতরণ করেন অর্থাৎ শিক্ষকতা করেন তাদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে।
দুনিয়াতে শিক্ষকের চেয়ে বড় কোনো পেশা বা সম্মান হতে পারে না। ইসলামে শিক্ষকের মর্যাদা অনেক বেশি, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেকে একজন শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "ইন্নামা বুইছতু মুয়াল্লিমা" আমাকে শিক্ষক হিসেবেই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে (সুনান ইবনে মাজাহ এবং সুনান আদ-দারেমি)।
হাদিসে আরো এসেছে:
"নিশ্চয়ই আলেমগণ বা জ্ঞানীরা হলেন
নবীগণের উত্তরাধিকারী।" (সুনানে আবু দাউদ)
শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন
ইসলাম বড়দের সম্মান করার নির্দেশ দেয়, আর শিক্ষকের স্থান
তো বাবা-মায়ের পরেই। হযরত আলী (রা.) বলেছিলেন, "যিনি আমাকে একটি অক্ষর শিক্ষা দিয়েছেন, আমি তাঁর দাস বনে যেতে রাজি আছি।"
পরকালীন জীবনে ইসলামী শিক্ষার প্রভাব
ইসলামের শিক্ষার গুরুত্ব কেবল এই পৃথিবীর জীবনের
মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সুফল মৃত্যুর
পরেও চলমান থাকে।
সদকায়ে জারিয়া বা চলমান সওয়াব
(H3)
মানুষ মারা গেলে তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের সওয়াব বন্ধ হয় না। তার
মধ্যে একটি হলো উপকারী জ্ঞান।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি মাধ্যম ছাড়া (১) সদকায়ে জারিয়া, (২) এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং (৩) সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহীহ মুসলিম)
সমাপনী
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব কেবল তাত্ত্বিক কোনো বিষয় নয়, এটি ঈমান ও আমলের সাথে
ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে, সংকীর্ণতা থেকে উদারতা শেখায় এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনে সাহায্য করে।


0 মন্তব্যসমূহ