বদর যুদ্ধে প্রথম শহীদ কে? তাঁর পরিচয় ও শাহাদাতের ইতিহাস

হযরত মিহজা ইবনে সালিহ (রা.)ছিলেন বদর যুদ্ধে প্রথম শহীদ


ইসলামের ইতিহাসের প্রথম নিয়মতান্ত্রিক সম্মুখ সমর ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম শহীদ হলেন হযরত মিহজা ইবনে সালিহ (রা.)তিনি আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর মুক্তদাসযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে শত্রু বাহিনীর নিক্ষিপ্ত তীর বিদ্ধ হয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

 ২য় হিজরী সালের ১৭ই রমজান সংঘটিত বদর যুদ্ধ মক্কার কুরাইশদের বিশাল ও সুসজ্জিত বাহিনীর বিপরীতে অনভিজ্ঞ, প্রায় নিরস্ত্র এবং সংখ্যায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম বাহিনী ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেএই মহান বিজয়ের ভিত্তি রচিত হয়েছিল এমন কিছু আত্মোৎসর্গকারী মহান সাহাবির পবিত্র রক্তের বিনিময়ে, যাঁরা ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষায় নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে যার নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে, তিনি হলেন হযরত মিহজা ইবনে সালিহ (রা.)তাঁর শাহাদাত ও আত্মত্যাগের সঠিক ইতিহাস জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য ঈমানী দায়িত্ব।

বদর যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি ছিল রাসূলুল্লাহ এবং মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। নিচে এই যুদ্ধের মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

·         যুদ্ধের সময়: ২য় হিজরির ১৭ই রমজান (মোতাবেক ১৩ই মার্চ, ৬ ২৪ খ্রিস্টাব্দ)। এটি ছিল জুমার দিন।

·         স্থান: মদিনা মুনাওয়ারা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত 'বদর' নামক একটি প্রান্তর, যা তৎকালীন সময়ে একটি বাণিজ্য কেন্দ্র এবং পানির কূপের জন্য বিখ্যাত ছিল।

·         মুসলিম ও কুরাইশ বাহিনীর সংখ্যা: মুসলিম বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জনঅন্যদিকে, মক্কার কুরাইশদের কাফের বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১,০০০ জন, যারা ছিল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত, ১০০টি ঘোড়া এবং ৭০০টি উটের বিশাল বহরসহ যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী।

·         ইসলামের ইতিহাসে এ যুদ্ধের গুরুত্ব: বদর যুদ্ধকে পবিত্র কুরআনে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের দিন বলা হয়েছে। যদি এই যুদ্ধে মুসলমানরা পরাজিত হতো, তবে তৎকালীন পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদত করার মতো কোনো মানুষ অবশিষ্ট থাকত না। এটি মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং আরবের বুকে ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় করে। এ জন্য ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম।

বদর যুদ্ধে প্রথম শহীদ কে?

বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং সীরাত গবেষকদের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী, বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে যিনি সর্বপ্রথম শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন, তিনি হলেন হযরত মিহজা ইবনে সালিহ (রা.) (مهجع بن صالح)তিনি ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি নিজের রক্ত দিয়ে বদর প্রান্তরের মাটিকে ধন্য করেছিলেন।

পূর্ণ নাম ও বংশপরিচয়

তাঁর পূর্ণ নাম মিহজা ইবনে সালিহ। তিনি মূলত ইয়েমেনের অধিবাসী ছিলেন। তৎকালীন আরবের দাসপ্রথা ও সামাজিক কাঠামোর কারণে তিনি মক্কায় আসেন এবং হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর মালিকানাধীন দাস হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন। পরবর্তীতে হযরত উমর (রা.) তাঁকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। একারণেই সীরাতের কিতাবগুলোতে তাঁকে প্রায়শই 'মিহজা মাওলা উমর ইবনুল খাত্তাব' (উমরের মুক্তদাস মিহজা) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ইসলাম গ্রহণের ঘটনা

হযরত মিহজা (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগের (আস-সাবিকুনাল আওয়ালুন) এর অন্যতম মুসলমান। মক্কায় যখন ইসলাম প্রচারের সূচনা হয় এবং আরবের কুরাইশরা মুসলমানদের ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু করে, ঠিক সেই কঠিন সময়ে তিনি নবী করীম -এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। একজন মুক্তদাস এবং ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে মক্কার মুশরিকদের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়, কিন্তু তিনি তাঁর ঈমানী অবস্থানে পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন।

রাসূল -এর সঙ্গে সম্পর্ক

রাসূলুল্লাহ হযরত মিহজা (রা.)-কে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূলের অত্যন্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত সাহাবি। রাসূলুল্লাহ তাঁর ঈমানী একাগ্রতা, তাকওয়া এবং নম্রতার প্রশংসা করতেন। মদিনায় হিজরতের পর রাসূল তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেন এবং বদর যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে তাঁকে মুসলিম বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করেন।

কীভাবে তিনি শহীদ হন?

বদর যুদ্ধের মূল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে তৎকালীন আরবের প্রথা অনুযায়ী মল্লযুদ্ধ (একক যুদ্ধ) অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু মল্লযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বা প্রথম পর্যায়ের সংঘর্ষের সময় একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে। কুরাইশ বাহিনীর অন্যতম তীরন্দাজ আমর ইবনুল হুদরামী মুসলিম শিবিরের দিকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করে।

হযরত মিহজা (রা.) তখন মুসলিম বাহিনীর সারির অগ্রভাগে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং যুদ্ধের জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন। হঠাৎ মুশরিকদের পক্ষ থেকে ধেয়ে আসা একটি বিষাক্ত ও ধারালো তীর সরাসরি তাঁর গলায় বা বুকে এসে বিদ্ধ হয়। তীরটি এতোটাই মারাত্মক ছিল যে, আঘাত লাগার সাথে সাথেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে শাহাদাত বরণ করেন।

সীরাত ইবনে হিশামের বর্ণনা:

ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেন যে, যখন দুই দল মুখোমুখি অবস্থান নিল এবং তীর বিনিময় শুরু হলো, তখন আমর ইবনুল হুদরামীর নিক্ষিপ্ত একটি তীরের আঘাতে হযরত মিহজা (রা.) শহীদ হন। তিনিই ছিলেন বদর যুদ্ধে মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম শাহাদাত বরণকারী সাহাবী

তাঁর এই আকস্মিক শাহাদাত মুসলিম বাহিনীর মধ্যে শোকের ছায়া নামানোর পরিবর্তে ঈমানী জযবা ও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। সাহাবিরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, জান্নাতের দরজা তাঁদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

হযরত মিহজা (রা.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

হযরত মিহজা (রা.)-এর জীবন ছিল ঈমান, হিজরত ও জিহাদের এক অনুপম মিশ্রণ। সংক্ষেপে তাঁর জীবনবৃত্তান্ত নিচে আলোচনা করা হলো:

১. মক্কার কঠিন জীবন ও ইসলাম গ্রহণ: হযরত মিহজা (রা.) আরবের ইয়েমেন থেকে ভাগ্য অন্বেষণে বা কোনো কারণে মক্কায় এসে দাসত্বে আবদ্ধ হন। হযরত উমর (রা.)-এর অধীনে থাকাকালীন তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন। তৎকালীন মক্কার দুর্বল ও দাস মুসলমানদের ওপর আবু জাহেল, ওতবা ও শায়বাদের নির্যাতন ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। মিহজা (রা.)-কেও সেই অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

২. মদিনায় হিজরত: রাসূলুল্লাহ যখন মুসলমানদের মদিনায় হিজরতের নির্দেশ দেন, তখন হযরত মিহজা (রা.) মক্কার সমস্ত মায়া ও সামান্য ধন-সম্পদ ত্যাগ করে কেবল ঈমান রক্ষার তাগিদে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় তিনি মুহাজির সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত হন। মদিনার আনসার সাহাবিরা তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন এবং তিনি সেখানে স্বাধীনভাবে ইবাদত-বন্দেগি শুরু করেন।

৩. ইসলামের জন্য ত্যাগ ও বদরের ডাক: হিজরতের পর মুসলমানদের ওপর যখন মক্কার কাফেরদের আক্রমণের ভয়াবহ হুমকি তৈরি হয়, তখন তিনি প্রতিটি প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতিতে শরিক হন। ২য় হিজরিতে যখন রাসূল আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা অবরোধের উদ্দেশ্যে সাহাবিদের বের হওয়ার আহ্বান জানান, যা পরবর্তীতে বদর যুদ্ধে রূপ নেয়, তখন হযরত মিহজা (রা.) আনন্দের সাথে সেই কাফেলায় যোগ দেন। তিনি জানতেন না যে এই যাত্রাই হবে তাঁর জান্নাত গমনের মাধ্যম।

বদর যুদ্ধে শহীদ সাহাবিদের তালিকায় তাঁর অবস্থান

ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পক্ষে মোট ১৪ জন সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন। এই ১৪ জন মহান বীরের মধ্যে ৬ জন ছিলেন মুহাজির, যাঁরা মক্কা থেকে হিজরত করে এসেছিলেন এবং ৮ জন ছিলেন আনসার যারা মদিনার স্থায়ী বাসিন্দাএই ১৪ জনের পবিত্র তালিকার সর্বাগ্রে যার নাম আসে, তিনি হলেন হযরত মিহজা ইবনে সালিহ (রা.)। তিনি মুহাজির সাহাবিদের মধ্যে প্রথম এবং সামগ্রিকভাবে পুরো বদর যুদ্ধেরই প্রথম শহীদ। এ যুদ্ধে শহীদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন বদর যুদ্ধে শহীদ সাহাবীদের নামের তালিকা”।

কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে শহীদের মর্যাদা

ইসলামে শাহাদাতের মর্যাদা আকাশচুম্বী। হযরত মিহজা (রা.)-সহ বদরের শহীদদের মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এক বিশেষ ও অনন্য মর্যাদা দান করেছেন।

পবিত্র কুরআনে রেফারেন্স

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা শহীদদের জীবিত বলে ঘোষণা করেছেন। সূরা আল-বাকারার ১৫৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন:

وَلاَ تَقُولُواْ لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبيلِ اللّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاء وَلَكِن لاَّ تَشْعُرُونَ

আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বোঝো না।” (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৪)

সংক্ষিপ্ত তাফসির: এই আয়াতটি বদর যুদ্ধের শহীদদের প্রেক্ষাপটেই অবতীর্ণ হয়েছিল বলে মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন। বদর যুদ্ধের পর মানুষ যখন শহীদ সাহাবিদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলত যে, আফসোস! অমুক ব্যক্তি মারা গেল এবং পৃথিবীর নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হলো, তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করে স্পষ্ট করে দেন যে, আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারীরা কখনো মৃত নয়; বরং তারা আল্লাহর সান্নিধ্যে বিশেষ রিজিক ও জীবন লাভ করে।

সহিহ হাদিসের রেফারেন্স

হযরত মিহজা (রা.)-এর শাহাদাত সম্পর্কে সুনানে ইবনে মাজা এবং মুসতাদরাকে হাকেমে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

عَنِ ابْنِعَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "سَيِّدُ الشُّهَدَاءِ مِهْجَعٌ، وَهُوَ أَوَّلُ مَنْ قُتِلَ يَوْمَ بَدْرٍ

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন: মিহজা হলেন শহীদদের নেতা এবং তিনিই বদর যুদ্ধের দিন সর্বপ্রথম শহীদ হয়েছেন।” (সূত্র: মুসতাদরাকে হাকেমে, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২০৫; সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস নম্বর: ২৮০৫-এর প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা)।

নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের গ্রন্থে এ ঘটনার উল্লেখ

ইসলামী ইতিহাসের প্রায় সকল প্রাচীন এবং নির্ভরযোগ্য সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থে হযরত মিহজা (রা.)-কে বদর যুদ্ধের প্রথম শহীদ হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

·         ১. সীরাত ইবনে ইসহাক: ইসলামের ইতিহাসের প্রাচীনতম সীরাতগ্রন্থ 'কিতাবুল মাগাযী'-তে ইবনে ইসহাক স্পষ্ট অক্ষরে লিখেছেন যে, বদর প্রান্তরে যখন মূল যুদ্ধ শুরুর আগে তীর নিক্ষেপ শুরু হয়, তখন আমর ইবনুল হুদরামীর তীরের আঘাতে হযরত উমর (রা.)-এর মুক্তদাস মিহজা (রা.) প্রথম শহীদ হন।

·         ২. সীরাত ইবনে হিশাম: ইবনে ইসহাকের সীরাতের পরিমার্জিত রূপ সীরাত ইবনে হিশামের ২য় খণ্ডে বদর যুদ্ধের শহীদদের আলোচনায় বলা হয়েছে, মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম যিনি শহীদ হন, তিনি হলেন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর মুক্তদাস মিহজা।

·         ৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: প্রখ্যাত মুফাসসির ও ঐতিহাসিক ইমাম ইবনে কাসির তাঁর সুবিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া'-র ৩য় খণ্ডে বদর যুদ্ধের অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন যে, বদরে মুসলমানদের বিজয়ের সূচনালগ্নেই মিহজা (রা.) তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ কোরবানি পেশ করে প্রথম শহীদের মর্যাদা লাভ করেন।

হযরত মিহজা (রা.)-এর শাহাদাত থেকে শিক্ষা

হযরত মিহজা (রা.)-এর শাহাদাত এবং বদর যুদ্ধের এই ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে বর্তমান যুগের মুসলমানদের জন্য বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে:

১. ঈমান ও আত্মত্যাগের পরাকাষ্ঠা: হযরত মিহজা (রা.) ছিলেন একজন মুক্তদাস। তৎকালীন আরবের সামাজিক দৃষ্টিতে দাসদের কোনো মূল্য ছিল না। কিন্তু ইসলাম তাঁকে এমন এক সুউচ্চ মর্যাদা দিয়েছে যে, তিনি ইসলামের প্রথম যুদ্ধের প্রথম শহীদ হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে রইলেন। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর দরবারে বংশ বা সামাজিক মর্যাদা নয়, ঈমান ও তাকওয়াই হলো মূল মাপকাঠি।

২. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন উৎসর্গ: বদরের শহীদরা দুনিয়ার কোনো লোভ-লালসা বা সম্পদের আশায় যুদ্ধক্ষেত্রে যাননি। তাঁরা গিয়েছিলেন দ্বীন ইসলামকে টিকিয়ে রাখতে এবং আল্লাহর কালীমাকে সমুন্নত করতে। হযরত মিহজা (রা.)-এর দ্রুত শাহাদাত আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর ডাক এলে জীবনের মায়া ত্যাগ করে অবিলম্বে সাড়া দিতে হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

১. বদর যুদ্ধে প্রথম শহীদ কে ছিলেন?

উত্তর: বদর যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে প্রথম শহীদ হযরত মিহজা ইবনে সালিহ (রা.), যিনি হযরত উমর (রা.)-এর মুক্তদাস ছিলেন।

২. তিনি মুহাজির না আনসার সাহাবী ছিলেন?

উত্তর: তিনি মূলত ইয়েমেনের অধিবাসী ছিলেন এবং মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। তাই তিনি একজন 'মুহাজির' সাহাবি ছিলেন।

৩. হযরত মিহজা (রা.) কীভাবে শহীদ হন?

উত্তর: বদর যুদ্ধের মূল লড়াই শুরুর ঠিক আগে কাফের বাহিনীর আমর ইবনুল হুদরামীর ছোঁড়া একটি তীর তাঁর গায়ে বা বুকে এসে বিদ্ধ হলে তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন।

৪. তাঁর কবর কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: ঐতিহাসিক বদর প্রান্তরেই (বর্তমান সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলের বদর গভর্নরেট) বদর যুদ্ধের অন্যান্য শহীদ সাহাবিদের সাথে তাঁর পবিত্র কবর অবস্থিত।

৫. বদরে মোট কতজন শহীদ হন?

উত্তর: বদর যুদ্ধে সর্বমোট ১৪ জন সাহাবি শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে ৬ জন মুহাজির এবং ৮ জন আনসার ছিলেন।

৬. প্রথম শহীদদের বিশেষ মর্যাদা কী?

উত্তর: রাসূলুল্লাহ তাঁকে 'সায়্যিদুশ শুহাদা' বা শহীদদের নেতা/প্রধান হিসেবে অভিহিত করেছেন।

৭. এ ঘটনা থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?

উত্তর: এ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, আল্লাহর দরবারে মানুষের সামাজিক দাসত্ব বা বংশমর্যাদা বড় নয়, বরং ঈমান ও আল্লাহর পথে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগই মানুষের জান্নাতের উচ্চ মর্যাদার অধিকারী করে।

উপসংহার

হযরত মিহজা ইবনে সালিহ (রা.)-এর শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসের এক গৌরবময় ও অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। বদর যুদ্ধে তাঁর প্রথম শহীদ হওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যে মহান রক্তের সূচনা হয়েছিল, তা কোনো বড় গোত্রীয় নেতা বা ধনী ব্যক্তির ছিল না; বরং তা ছিল একজন নিষ্ঠাবান, মুখলিস এবং আল্লাহভীরু মুক্তদাসের। আজ শত শত বছর পরও বদর যুদ্ধের ইতিহাস আলোচনায় হযরত মিহজা (রা.)-এর নাম শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়। মহান আল্লাহ তাআলা হযরত মিহজা (রা.)-সহ বদরের সকল শহীদ সাহাবিদের প্রতি অগনিত রহমত বর্ষণ করুন। আমীন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ