মানব ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী এক ঐতিহাসিক দলিল হলো মদিনা সনদ।
আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশত বছর আগে,
যখন সমগ্র জাজিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপ গোত্রীয় কলহ, রক্তক্ষয়ী সংঘাত, নৈরাজ্য এবং কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল,
তখন মদিনা সনদ নামক যুগান্তকারী চুক্তির মাধ্যমে শান্তি ও মানবতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ
ﷺ মদিনায় হিজরত করার পর এই ঐতিহাসিক চুক্তিপত্র প্রস্তুত করেন।
এটি কেবল ধর্মীয় সম্প্রীতির কোনো সাধারণ দলিল ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও একে রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।
প্রতিযোগিতাপূর্ণ সার্চ ইঞ্জিনের দুনিয়ায়
"মদিনা সনদ"
বা Charter
of Medina সম্পর্কে সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ এবং গবেষণালব্ধ তথ্যের অভাব মেটাতে আমাদের এই আয়োজন। এই আর্টিকেলে আমরা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মদিনা সনদের ধারা,
মুসলিম-অমুসলিমদের অধিকার,
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের সাথে এর তুলনা এবং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর প্রভাব নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করব।
মদিনা
সনদ কী?
সহজ ভাষায়,
মদিনা সনদ হলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ
ﷺ কর্তৃক প্রণীত পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত একটি চুক্তি বা শাসনতান্ত্রিক দলিল। এর মাধ্যমে মদিনায় বসবাসকারী মুসলিম, ইহুদি,
খ্রিষ্টান এবং পৌত্তলিক গোত্রগুলোর পারস্পরিক সহাবস্থান এবং অধিকার রক্ষা নিশ্চিত করা হয়।
- ইংরেজি নাম: এটি আন্তর্জাতিকভাবে The Constitution of Medina বা
Charter of Medina নামে
পরিচিত।
- আরবি নাম: ইসলামিক পরিভাষায় ও
প্রাচীন ইতিহাসে একে
‘কিতাব’ (দলিল) বা
‘সহিফা’ (পত্র) বলা
হয়েছে। সমকালীন গ্রন্থে
একে Dustur al-Madinah (دُسْتُور
الْمَدِينَة) হিসেবে উল্লেখ করা
হয়েছে।
কেন
একে "বিশ্বের
প্রথম লিখিত সংবিধান"
বলা হয়?
মদিনা সনদের পূর্বে পৃথিবীতে বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের আইন বা ঘোষণা ছিল, যেমন:
ব্যাবিলনের হাম্মুরাবির আইন বা রোমান আইন। সেগুলোতে কোনো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের অধিকার, কর্তব্য,
বিচার ব্যবস্থা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা সম্বলিত কোনো যৌথ বা দ্বিপাক্ষিক 'সংবিধান'
ছিল না। মদিনা সনদে একটি বহু-সাংস্কৃতিক, বহু-ধর্মীয় ও বহুমাত্রিক সমাজকে একটি একক 'উম্মাহ'
বা রাজনৈতিক ব্লকে রূপ দেওয়া হয়েছিল,
যা আধুনিক রাষ্ট্রের সংবিধানের মূল ভিত্তি। এজন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা একে মানব ইতিহাসের প্রথম লিখিত
শাসনতান্ত্রিক সংবিধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
মদিনা সনদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মদিনা সনদের গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য তৎকালীন মদিনা তথা ইয়াসরিব এর সামাজিক,
অর্থনৈতিক ও
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জানা আবশ্যক। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে নবী মুহাম্মদ
ﷺ এবং তাঁর মক্কী সাহাবিরা মক্কার কুরাইশদের অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আল্লাহর আদেশে মদিনায় হিজরত করেন। হিজরতের পর মদিনার সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও নাজুক ছিল। কেননা তারা ছিল বিভিন্ন গোত্র ও দলে
বিভক্ত। এই বিভক্ত জীবন তাদের মধ্যে শান্তির পরিবর্তে হিংসা-বিদ্বেষ এবং অরাজকতার জন্ম দিয়ে যাচ্ছিল। নিন্মে তাদের সামাজিক অবস্থার বিবরণ দেয়া হলো:
- আওস
ও খাজরাজ গোত্র: মদিনার
প্রধান দুটি পৌত্তলিক
আরব গোত্র ছিল
আওস ও খাজরাজ।
তারা দীর্ঘ ১২০
বছর ধরে পারস্পরিক
রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বুয়াসের যুদ্ধে লিপ্ত ছিল।
হিজরতের পর তারা
ইসলাম গ্রহণ করে
আনসার হিসেবে আত্মপ্রকাশ
করলেও তাদের মধ্যকার
অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ সম্পূর্ণ
প্রশমিত করার জন্য
একটি আইনি কাঠামোর
প্রয়োজন ছিল।
- মদিনার
ইহুদি গোত্রসমূহ: মদিনা ও এর
আশেপাশে বেশ কিছু
শক্তিশালী ইহুদি গোত্র
বসবাস করত। তাদের
মধ্যে প্রধান তিনটি
গোত্র ছিল বনু কাইনুকা, বনু নাযির এবং বানু
কুরাইযা। তাছাড়া বনু
আওফ, বনু
সাঈদাসহ আরও উপগোত্র
ছিল। তারা অর্থনৈতিকভাবে
মদিনার চালিকাশক্তি ছিল
এবং আরবের গোত্রীয়
কোন্দলের সুযোগ নিয়ে
নিজেদের স্বার্থ হাসিল
করত।
- সামাজিক
ও রাজনৈতিক সংকট: মদিনায় কোনো কেন্দ্রীয়
শাসনব্যবস্থা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
ছিল না। গোত্রের
আইনই ছিল প্রধান
আইন। রক্তপাত ও
প্রতিশোধের এক অন্তহীন
চক্র সচল ছিল।
এর ওপর মক্কা
থেকে আসা মুহাজিরদের
পুনর্বাসন এবং মক্কার
কুরাইশদের সম্ভাব্য আক্রমণের
হুমকি মদিনাকে এক
চরম অস্থিরতার মুখে
দাঁড় করিয়েছিল।
মদিনা সনদ প্রণয়নের কারণ
মহানবী ﷺ মদিনায় পৌঁছানোর পর একটি কল্যাণমুখী এবং নিরাপদ মদিনা রাষ্ট্র
প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে এই সনদ প্রণয়ন করেন:
- নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: মক্কার
কুরাইশরা মদিনায় মুসলিমদের
এই উত্থান সহজে
মেনে নেয়নি। তাদের
সম্ভাব্য বহিরাক্রমণ থেকে
মদিনা শহরকে রক্ষা
করার জন্য একটি
সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার
প্রয়োজন ছিল।
- আভ্যন্তরীণ শান্তি
ও স্থায়িত্ব: আওস, খাজরাজ
এবং ইহুদিদের দীর্ঘদিনের
গোত্রীয় কোন্দলের অবসান
ঘটিয়ে মদিনার অভ্যন্তরে
শান্তি ফিরিয়ে আনা।
- আইনের
শাসন প্রতিষ্ঠা: ‘জোর যার মুল্লুক
তার’ এই
জাহেলি নীতি উচ্ছেদ
করে একটি কেন্দ্রীয়
বিচার ব্যবস্থা ও
সার্বভৌম আইনি কর্তৃপক্ষ
গঠন করা।
- ধর্মীয়
সহাবস্থান ও স্বাধীনতা: মদিনায়
মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদি,
খ্রিষ্টান ও পৌত্তলিকদের
নিজ নিজ ধর্ম
স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার
দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক
সমাজ গঠন করা।
- মুহাজিরদের পুনর্বাসন: মক্কা
থেকে সর্বস্ব হারিয়ে
আসা মুহাজিরদের সামাজিক
ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
নিশ্চিত করা।
মদিনা
সনদ কবে, কোথায়,
কে প্রণয়ন করেন?
- কবে
প্রণীত হয়: ঐতিহাসিকদের অধিকাংশের মতে, মদিনা সনদ হিজরতের
প্রথম বর্ষে, অর্থাৎ
৬২২ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগে বা ৬২৩
খ্রিষ্টাব্দের প্রথমভাগে প্রণীত
হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক
ইবনে ইসহাকের মতে, হিজরতের পর মসজিদে
নববী নির্মাণ এবং
মুহাজির ও আনসারদের
মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন
(মুআখাত) স্থাপনের
পরপরই এই চুক্তি
স্বাক্ষরিত হয়।
- কোথায়
প্রণীত হয়: সনদটি মদিনার প্রথম
ইসলামী কেন্দ্র মসজিদে
নববী-তে
অথবা আনসার সাহাবি
হযরত আনাস ইবনে
মালিক (রা.)-এর বাড়িতে বসে
প্রস্তুত ও অনুমোদিত
হয়েছিল।
- কে
প্রণয়ন করেন: এই সনদের মূল
স্থপতি, পরিকল্পনাকারী
এবং ঘোষক ছিলেন
স্বয়ং নবী মুহাম্মদ
ﷺ। তিনি মদিনার
সকল মুসলিম, আনসার,
মুহাজির এবং ইহুদি
গোত্রপ্রধানদের ডেকে তাদের
পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে
এই রূপরেখা তৈরি
করেন।
মদিনা
সনদের মোট ধারা
কয়টি?
মদিনা সনদের মোট ধারা কতটি—তা নিয়ে আধুনিক গবেষক ও
প্রাচীন ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু বিন্যাসগত মতভেদ রয়েছে। তবে মূল টেক্সটের তথ্যের ক্ষেত্রে কোনো অমিল নেই।
- ৪৭ ধারা বনাম
৫২ ধারা: প্রাচীন ঐতিহাসিক ইবনে
হিশাম এবং ইবনে
ইসহাক তাদের গ্রন্থে
সনদের যে সম্পূর্ণ
বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন,
সেখানে আধুনিক গবেষকরা
বিষয়বস্তু ও বাক্যবিন্যাসের
ওপর ভিত্তি করে
একে বিভিন্ন ধারায়
বিভক্ত করেছেন। ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর মতো
প্রখ্যাত ইসলামী আইনবিদ
ও গবেষকদের মতে, মদিনা সনদের মোট
ধারা ৫২টি। এর
মধ্যে প্রথম ২৫টি
ধারা মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ
সম্পর্ক বিষয়ক এবং
অবশিষ্ট ২৭টি ধারা
অমুসলিম, বিশেষ
করে ইহুদিদের অধিকার
ও কর্তব্য এবং
সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বিষয়ক।
আবার কোনো কোনো
গবেষক একে ৪৭টি
প্রধান ধারায় বিন্যস্ত
করেছেন।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি: ধারা বিভাজনের এই তারতম্য কেবল নাম্বারিং বা বিন্যাসের কারণে হয়েছে, মূল দলিলে কোনো পরিবর্তন বা তথ্যের ঘাটতি নেই।
মদিনা সনদের মূল বিষয়বস্তু ও ধারাগুলোর সহজ ব্যাখ্যা
মদিনা সনদের ধারাগুলোকে সহজ ও বোধগম্য উপায়ে বিশ্লেষণ করলে এর মূল কাঠামো আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিচে এর প্রধান ধারাগুলোর সারমর্ম ও আইনি ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. এক উম্মাহ বা একক জাতি গঠন
সনদের শুরুতেই ঘোষণা করা হয় যে,
কুরাইশ ও
ইয়াসরিব তথা
মদিনার মুমিনরা ও যারা তাদের অনুসারী হবে এবং তাদের সাথে যুক্ত হয়ে জিহাদ করবে,
তারা অন্য সমস্ত মানুষের বিপরীতে একটি একক জাতি (উম্মাহ
ওয়াহিদা) হিসেবে গণ্য হবে। এটি ছিল ভূখণ্ড বা বংশের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বাসের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের প্রথম ঘোষণা।
২. রক্তপণ ও বন্দিমুক্তি
(দিয়াত)
মুহাজির এবং আনসারদের প্রতিটি গোত্র (যেমন:
বনু আওফ,
বনু সাঈদা,
বনু হারিস ইত্যাদি) তাদের পূর্বতন ন্যায়সঙ্গত প্রথা অনুযায়ী নিজেদের মধ্যে রক্তপণ (খুনের বদলা বা ক্ষতিপূরণ) পরিশোধ করবে। তারা ন্যায়বিচার ও
সততার সাথে নিজেদের বন্দিদের মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করবে।
৩. অপরাধ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ
কোনো ব্যক্তি যদি সমাজে অন্যায়, সীমালঙ্ঘন,
বিদ্রোহ বা ষড়যন্ত্র ছড়ানোর চেষ্টা করে,
তবে সকল নাগরিক তার বিরুদ্ধে দলবদ্ধভাবে অবস্থান নেবে। অপরাধী যদি কারো আপন সন্তানও হয়,
তবুও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।
৪. আল্লাহর জিম্মা ও নিরাপত্তা
সবচেয়ে দুর্বল বা সাধারণ মুসলমানের দেওয়া নিরাপত্তা বা আশ্রয়কেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। আল্লাহর জিম্মা (নিরাপত্তা)
সবার জন্য সমান। একজন মুমিন অন্য মুমিনের ভাই,
তাই বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে তারা একে অপরের সাহায্যকারী হবে।
৫. অমুসলিমদের (ইহুদিদের) নাগরিক অধিকার
যেসব ইহুদি এই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে,
তারা মুসলিমদের মতোই সমান সাহায্য ও
সহানুভূতি পাবে। তাদের ওপর কোনো অন্যায় করা হবে না এবং তাদের শত্রুদের সাহায্য করা হবে না।
৬. শান্তি ও যুদ্ধ ঘোষণা
মুমিনদের শান্তি হবে একক ও অবিভাজ্য। আল্লাহর পথে যুদ্ধ চলাকালীন কোনো মুমিন অন্য মুমিনকে বাদ দিয়ে শত্রুর সাথে এককভাবে কোনো শান্তি চুক্তি করতে পারবে না, যদি না তা সবার জন্য সমান ও
ন্যায়সঙ্গত হয়।
৭. বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ কর্তপক্ষ
সনদের অন্যতম প্রধান ধারা ছিল—নাগরিকদের মধ্যে যদি কোনো বিষয়ে মতবিরোধ বা ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি হয়,
তবে তার মীমাংসার জন্য বিষয়টি আল্লাহ এবং
তাঁর রাসুল মুহাম্মদ
ﷺ এর দরবারে পেশ করতে হবে। এর মাধ্যমে মহানবী ﷺ মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি ও
সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সর্বসম্মত স্বীকৃতি পান।
মদিনা সনদের গুরুত্বপূর্ণ উপ-বিভাগ ও অধিকারসমূহ
মদিনা সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক চুক্তি ছিল না,
এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকারের চার্টার। এর বিভিন্ন ধারায় সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছিল।
মুসলিমদের অধিকার ও দায়িত্ব
- মুসলিমরা একে অপরের
জান-মালের
নিরাপত্তা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ
থাকবে;
- কোনো মুমিন কোনো
কাফিরের (অবিশ্বাসী)
বিনিময়ে অন্য মুমিনকে
হত্যা করতে পারবে
না;
- ইসলামের মূল স্তম্ভ
ও আদর্শ অক্ষুণ্ণ
রেখে রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন
মেনে চলতে হবে।
অমুসলিমদের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা
মদিনা সনদে অমুসলিমদের, বিশেষ করে ইহুদিদের ধর্মীয় স্বাধীনতার যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল,
তা তৎকালীন বিশ্বে অবাস্তব ছিল। সনদে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
"ইহুদিদের জন্য তাদের ধর্ম এবং মুসলিমদের জন্য তাদের ধর্ম।"
ইহুদিরা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব, উপাসনা এবং পারিবারিক আইন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার অধিকার লাভ করবে।
জোরপূর্বক তাদেরকে অন্য ধর্মগ্রহণে বাধ্য করা যাবে না বলে নীতি নির্ধারিত হয়।
নারী, শিশু ও দুর্বলদের নিরাপত্তা
সনদের একটি ধারায় বলা হয়েছে, কোনো আশ্রয়প্রার্থী বা দুর্বল ব্যক্তিকে তখনই আশ্রয় দেওয়া যাবে, যখন তার পরিবারের বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের অনুমতি থাকবে। এর মাধ্যমে সমাজে নারী ও
শিশুদের অন্যায়ভাবে গোত্রচ্যুত করা বা তাদের ওপর অত্যাচার করার পথ বন্ধ হয়। সমাজের দুর্বলতম অংশও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার লাভ করে।
প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধনীতি
- সম্মিলিত প্রতিরক্ষা: মদিনা যদি কোনো
বহিরাগত শত্রু দ্বারা
আক্রান্ত হয়,
তবে মুসলিম এবং
ইহুদি উভয় পক্ষ
মিলে যৌথভাবে মদিনা
রক্ষা করবে।
- যুদ্ধের খরচ: যুদ্ধের সময় ইহুদিরা
তাদের নিজস্ব খরচ
বহন করবে এবং
মুসলিমরা তাদের নিজস্ব
খরচ বহন করবে।
কেউ কারো ওপর
অর্থনৈতিক বোঝা চাপাবে
না।
- কুরাইশদের বর্জন: মক্কার কুরাইশ বা
তাদের কোনো সাহায্যকারীকে
মদিনার কোনো নাগরিক
(মুসলিম বা ইহুদি)
আশ্রয় দিতে পারবে
না বা তাদের
সাথে কোনো গোপন
চুক্তি করতে পারবে
না।
মদিনা সনদের মূল বৈশিষ্ট্য ও উদ্দেশ্য
প্রধান
বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- লিখিত রূপ: এটিই প্রথম কোনো
রাষ্ট্রীয় দলিল যা
সম্পূর্ণ লিখিত আকারে
সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন
করা হয়।
- বহু-ধর্মীয়
ফেডারেশন: বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে
অন্তর্ভুক্ত করে একটি 'ফেডারেল' বা
যৌথ রাষ্ট্রীয় কাঠামো
তৈরি করা হয়েছিল।
- কেন্দ্রীয় আইন কাঠামো: গোত্রীয়
প্রধানদের ক্ষমতার ওপর
রাষ্ট্রীয় ও ঐশ্বরিক
আইনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা
করা হয়।
- ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা: সনদে বলা হয়, অপরাধের জন্য কেবল
অপরাধী নিজেই দায়ী
থাকবে, তার
পুরো গোত্রকে দায়ী
করা যাবে না (যা ছিল জাহেলি
আরবের এক কুপ্রথা)।
মূল
উদ্দেশ্য:
- মদিনায় একটি সুশৃঙ্খল,
শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ
সমাজ বিনির্মাণ।
- বহিরাগত কুরাইশ ও
অন্যান্য শত্রু ভাবাপন্ন
শক্তির আগ্রাসন রুখে
দেওয়া।
- ইসলামের দাওয়াত প্রচারের
জন্য একটি স্থিতিশীল
পরিবেশ ও রাজনৈতিক
ভিত্তি তৈরি করা।
- বিশ্বের সামনে ন্যায়বিচার
ও ইনসাফের এক
বাস্তব উদাহরণ সৃষ্টি
করা।
আধুনিক সংবিধানের সাথে মদিনা সনদের তুলনা
মদিনা সনদ আজ থেকে ১৪০০ বছর আগের দলিল হলেও এর আধুনিকতা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের চমকে দেয়। নিচে তুলনামূলক টেবিলের মাধ্যমে তা দেখানো হলো:
|
বৈশিষ্ট্য / বিষয় |
মদিনা সনদ
(৬২২ খ্রি.) |
আধুনিক গণতান্ত্রিক সংবিধান |
|
ধর্মীয় স্বাধীনতা |
শতভাগ নিশ্চিত;
প্রতিটি
গোত্র
নিজস্ব
ধর্ম
পালনে
স্বাধীন। |
ধর্মনিরপেক্ষতা বা রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। |
|
সার্বভৌমত্ব |
আল্লাহর আইন এবং রাসুলুল্লাহ
ﷺ-এর বিচারিক সিদ্ধান্ত। |
জনগণের সম্মতি বা সংসদের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা। |
|
নাগরিকত্ব |
বিশ্বাসের ঐক্য এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত। |
জন্মসূত্র বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নাগরিকত্ব। |
|
প্রতিরক্ষা নীতি |
রাষ্ট্রের সকল গোত্রের সম্মিলিত ও বাধ্যতামূলক অংশীদারিত্ব। |
পেশাদার সেনাবাহিনী এবং জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় সেবা। |
|
অপরাধের দায় |
ব্যক্তিভিত্তিক দায়;
গোত্রীয়
শাস্তির
অবসান। |
সম্পূর্ণ ব্যক্তিভিত্তিক
(Individual Liability); আইনের চোখে সবাই সমান। |
মদিনা সনদ: মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও ধর্মীয় সহনশীলতা
১. মানবাধিকারের প্রথম সনদ
জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা
(UDHR) করেছে। কিন্তু তার বহু আগে মদিনা সনদে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, জান-মালের নিরাপত্তা এবং আশ্রয়ের অধিকার আইনিভাবে সুরক্ষিত করা হয়েছে। কোনো নিরীহ মানুষকে কেবল তার বংশ বা ধর্মের কারণে হত্যা করা যাবে না—এই কঠোর আইন মানবাধিকারের এক অনন্য মাইলফলক।
২. মদিনা সনদ ও গণতন্ত্র
যদিও মদিনা রাষ্ট্র ছিল ওহী বা ঐশ্বরিক নির্দেশনার অধীন, তবুও এর প্রশাসনিক ও সামাজিক সিদ্ধান্তগুলোতে 'শুরা'
বা পারস্পরিক পরামর্শের নীতিতে বাস্তবায়িত হতো। মদিনা সনদ প্রণয়নের সময় মদিনার প্রতিটি গোত্রপ্রধানের মতামত ও সম্মতি নেওয়া হয়েছিল,
যা আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল স্পিরিট—অর্থাৎ "শাসিতের
সম্মতি"।
৩. ধর্মীয় সহনশীলতার মহাসনদ
আজকের বিশ্বে যখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এক প্রধান সমস্যা,
তখন মদিনা সনদ আমাদের দেখায় কীভাবে ভিন্নধর্মী নাগরিকদের বুকে টেনে নিতে হয়। মদিনার ইহুদিদের রাষ্ট্রীয় মিত্র হিসেবে ঘোষণা করে তাদের জান-মালকে মুসলিমদের জান-মালের মতোই পবিত্র ঘোষণা করা হয়েছিল।
বর্তমান বিশ্বে মদিনা সনদের প্রাসঙ্গিকতা
আজকের বহুমাত্রিক ও বহু-সাংস্কৃতিক (Multicultural) বিশ্বে
মদিনা সনদের শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
- সংখ্যালঘু অধিকার
রক্ষা: মদিনা সনদ প্রমাণ
করে যে,
একটি আদর্শ ইসলামী
রাষ্ট্রে অমুসলিম বা
সংখ্যালঘুরা দ্বিতীয় শ্রেণীর
নাগরিক নয়,
বরং তারা রাষ্ট্রের
সমান অংশীদার।
- উগ্রবাদ
ও সন্ত্রাসবাদ দমন: সনদের অন্যতম শিক্ষা
হলো—অপরাধী
যে-ই
হোক, তার
কোনো ধর্ম বা
গোত্রীয় পরিচয় থাকবে
না। অপরাধীকে সম্মিলিতভাবে
প্রতিহত করতে হবে।
- চুক্তি
রক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইন: মদিনা
সনদ আমাদের শেখায়
আন্তর্জাতিক বা দ্বিপাক্ষিক
চুক্তি কতটা পবিত্র।
পবিত্র কুরআনেও চুক্তি
রক্ষার তাগিদ দেওয়া
হয়েছে।
সাধারণ ভুল ধারণা (Misconceptions) ও তার নিরসন
মদিনা সনদ নিয়ে কিছু মহল বা সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে,
যা দূর করা অত্যন্ত প্রয়োজন:
ভুল
ধারণা ১:
এটি কি শুধু
মুসলমানদের জন্য আইন
ছিল?
বাস্তবতা: একদমই না। এটি ছিল মদিনার সামগ্রিক ভূখণ্ডের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় সংবিধান। এতে মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদি,
পৌত্তলিক এবং পরবর্তীতে খ্রিষ্টানদের অধিকার ও
কর্তব্যও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ভুল
ধারণা ২:
এটি কি কেবল
একটি যুদ্ধকালীন সামরিক
চুক্তি ছিল?
বাস্তবতা: যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সত্য,
কিন্তু এটি কেবল সামরিক চুক্তি ছিল না। এতে দেওয়ানি আইন,
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা, সামাজিক কল্যাণ তহবিল
(রক্তপণ ও
মুক্তিপণ বণ্টন)
এবং নাগরিক অধিকারের বিস্তারিত রূপরেখা ছিল।
ভুল
ধারণা ৩:
এটি কি আধুনিক
ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মতো?
বাস্তবতা: না,
মদিনা সনদ ধর্মনিরপেক্ষ (Secular) ছিল না। এর মূল ভিত্তি ছিল তাওহীদ এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর চূড়ান্ত ফয়সালা। তবে এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও
অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের নিশ্চয়তা দিয়েছিল,
যা অনেক আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের চেয়েও বেশি কার্যকর ছিল।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে মদিনা সনদ
মদিনা সনদের মূল স্পিরিট বা চেতনা সম্পূর্ণ কুরআনের সুরা ও
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত।
প্রাসঙ্গিক
কুরআনের আয়াত:
চুক্তি রক্ষা এবং অমুসলিমদের সাথে ন্যায়বিচার প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
لَآ إِكْرَاهَ فِى ٱلدِّينِۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشْدُ مِنَ ٱلْغَىِّۚ
فَمَن يَكْفُرْ بِٱلطَّـٰغُوتِ وَيُؤْمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسْتَمْسَكَ بِٱلْعُرْوَةِ
ٱلْوُثْقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَاۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“দীন
গ্রহণের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে।
অতএব, যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি
ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
— (সুরা
আল-বাকারাহ, আয়াত:
২৫৬)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন:
لَّا يَنْهَـٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمْ
يُقَـٰتِلُوكُمْ فِى ٱلدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَـٰرِكُمْ أَن
تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوٓاْ إِلَيْهِمْۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُقْسِطِي
" দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের
বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে
এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ
ন্যায় পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। "
— (সুরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত: ৮)
সহিহ
হাদিসের নির্দেশনা:
অমুসলিম নাগরিকদের
(যাদের ইসলামী পরিভাষায় 'জিম্মি'
বা চুক্তিবদ্ধ নাগরিক বলা হয়) অধিকার রক্ষা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন:
أَلَا مَنْ ظَلَمَ
مُعَاهِدًا، أَوِ انْتَقَصَهُ، أَوْ كَلَّفَهُ فَوْقَ طَاقَتِهِ، أَوْ أَخَذَ
مِنْهُ شَيْئًا بِغَيْرِ طِيبِ نَفْسٍ، فَأَنَا حَجِيجُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির উপর যুলম করবে
বা তার প্রাপ্য কম দিবে কিংবা তাকে তার সামর্থের বাইরে কিছু করতে বাধ্য করবে অথবা
তার সন্তুষ্টিমূলক সম্মতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদী হবো।" (সূনান
আবু দাউদ,
হাদিস নং:
৩০৫২, সহিহ)
ঐতিহাসিক সূত্রসমূহ ও রেফারেন্স
মদিনা সনদের নির্ভরযোগ্যতা ও
ঐতিহাসিক সত্যতা ইসলামের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত ইতিহাস গ্রন্থসমূহ দ্বারা প্রমাণিত। নিচে প্রধান সূত্রগুলোর পরিচয় দেওয়া হলো:
1.
সীরাত ইবনে
ইসহাক (محمد بن إسحاق): এটি মহানবী
ﷺ-এর জীবনের সবচেয়ে প্রাচীন এবং আদি সীরাত গ্রন্থ। হিজরি দ্বিতীয় শতকের শুরুতে সংকলিত এই গ্রন্থে মদিনা সনদের সম্পূর্ণ টেক্সট প্রথম লিপিবদ্ধ করা হয়।
2.
সীরাত ইবনে
হিশাম (سيرة ابن هشام): ইবনে ইসহাকের সীরাতের ওপর ভিত্তি করে রচিত এই গ্রন্থটি ইসলামী ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সীরাত গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। এতে মদিনা সনদের প্রতিটি ধারা হুবহু উল্লেখ করা হয়েছে।
3.
কিতাবুল মাগাজি
- আল-ওয়াকিদি
(الواقدي):
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অভিযানসমূহের বিস্তারিত বিবরণে আল-ওয়াকিদি মদিনা সনদের প্রেক্ষাপট আলোচনা করেছেন।
4.
তারিখুর রাসুল
ওয়াল মুলুক - ইমাম
আল-তাবারি
(تاريخ الطبري): ইতিহাসের ইমাম আল-তাবারি তাঁর সুবিশাল ইতিহাস গ্রন্থে মদিনা সনদের চুক্তি ও
এর রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।
5.
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া
- ইবনে কাসির (ابن كثير): হাফেজ ইবনে কাসির তাঁর এই বিখ্যাত গ্রন্থে মদিনা সনদের সনাদ বা সূত্রগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন এবং এর ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
মদিনা সনদ নিয়ে গবেষকদের মতামত
ইসলামী
ইতিহাসবিদ ও স্কলারদের
দৃষ্টিভঙ্গি:
ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ (Dr. Muhammad Hamidullah), যিনি প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপর বিশেষজ্ঞ ছিলেন, তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "The
First Written Constitution in the World" এ
প্রমাণ করেছেন যে, মদিনা সনদই পৃথিবীর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক লিখিত সংবিধান। আধুনিক ইসলামী স্কলারদের মতে,
এটি ইসলামী শরিয়তের রাষ্ট্রীয় প্রয়োগের প্রথম বাস্তব রূপ।
পশ্চিমা
ও প্রাচ্যবিদদের (Orientalists) মতামত:
অনেক পশ্চিমা গবেষকও মদিনা সনদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন:
·
ওয়েলহাউসেন (Julius Wellhausen):
বিখ্যাত জার্মান প্রাচ্যবিদ মদিনা সনদের ঐতিহাসিক সত্যতা স্বীকার করে একে মহানবী ﷺ-এর রাজনৈতিক ও
কূটনৈতিক মেধার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
·
ডব্লিউ. মন্টগোমারি
ওয়াট (W. Montgomery Watt):
তাঁর "Muhammad
at Medina" গ্রন্থে লিখেছেন,
এই সনদটি তৎকালীন মদিনার গোত্রীয় সমাজকে একটি আধুনিক রাজনৈতিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের ক্ষেত্রে এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করেছিল। এর মাধ্যমে মুহাম্মদ
ﷺ নিজেকে কেবল একজন ধর্মীয় প্রচারক নন,
বরং একজন শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রমাণ করেন।
FAQ: গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
১. মদিনা সনদ কী?
উত্তর: মদিনা সনদ হলো হিজরতের পর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনা রাষ্ট্রে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় সহাবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ
ﷺ কর্তৃক প্রণীত বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান।
২. মদিনা সনদ কে
প্রণয়ন করেন?
উত্তর: মদিনা সনদ স্বয়ং মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ মদিনার মুসলিম এবং অমুসলিম গোত্রসমূহের পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে প্রণয়ন করেন।
৩. মদিনা সনদ কত
সালে প্রণীত হয়?
উত্তর: মদিনা সনদ হিজরতের প্রথম বর্ষে,
অর্থাৎ ইংরেজি ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগে বা ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দের প্রথমভাগে প্রণীত হয়।
৪. মদিনা সনদের মোট
ধারা কয়টি?
উত্তর: বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও
গবেষকদের ধারা বিন্যাসের তারতম্য অনুযায়ী এর মোট ধারা ৪৭টি বা ৫২টি। তবে ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর মতে এর ধারা সংখ্যা ৫২টি।
৫. বিশ্বের প্রথম লিখিত
সংবিধান কোনটি?
উত্তর: ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী
ﷺ কর্তৃক প্রণীত
"মদিনা সনদ"
(The Constitution of Medina)-কে
বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান বলা হয়।
৬. মদিনা সনদ কোথায়
স্বাক্ষরিত বা প্রণীত
হয়?
উত্তর: মদিনা সনদ মদিনার প্রথম ইসলামী কেন্দ্র মসজিদে নববীতে অথবা সাহাবি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বাসভবনে বসে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হয়।
৭. মদিনা সনদের প্রধান
উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: মদিনা সনদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মদিনার অভ্যন্তরীণ গোত্রীয় কলহ দূর করা,
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং কুরাইশদের বহিরাক্রমণ থেকে মদিনাকে রক্ষা করা।
৮. মদিনা সনদে অমুসলিমদের
অধিকার কেমন ছিল?
উত্তর: মদিনা সনদে অমুসলিমদের (বিশেষ করে ইহুদিদের) পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা,
নাগরিক অধিকার এবং জান-মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল।
৯. মদিনা সনদে ধর্মীয়
স্বাধীনতা সম্পর্কে কী
বলা হয়েছে?
উত্তর: সনদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, "ইহুদিদের জন্য তাদের ধর্ম এবং মুসলিমদের জন্য তাদের ধর্ম।"
কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
১০. "উম্মাহ" শব্দের
অর্থ কী এবং
মদিনা সনদে এর
তাৎপর্য কী?
উত্তর: 'উম্মাহ'
শব্দের অর্থ জাতি বা সম্প্রদায়। মদিনা সনদে মদিনার সকল মুসলিম ও অনুসারী অমুসলিমদের নিয়ে একটি একক রাজনৈতিক জাতি বা 'উম্মাহ ওয়াহিদা' গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
১১. মদিনা সনদের ঐতিহাসিক
উৎসগুলো কী কী?
উত্তর: প্রধান উৎসসমূহ হলো সীরাত ইবনে ইসহাক, সীরাত ইবনে হিশাম,
তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক
(তাবারি) এবং আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইবনে কাসির)।
১২. মদিনা সনদের সময়
মদিনার প্রধান দুটি
আরব গোত্র কারা
ছিল?
উত্তর: মদিনার প্রধান দুটি পৌত্তলিক আরব গোত্র ছিল আওস (Aws) এবং খাজরাজ (Khazraj), যারা পরে ইসলাম গ্রহণ করে
'আনসার' নামে পরিচিত হন।
১৩. মদিনা সনদের সময়
মদিনার তিনটি প্রধান
ইহুদি গোত্র কী
কী ছিল?
উত্তর: প্রধান তিনটি ইহুদি গোত্র হলো—বানু কাইনুকা
(Banu Qaynuqa), বানু নাযির
(Banu Nadir), এবং বানু কুরাইযা (Banu Qurayza)।
১০. মদিনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ
বিচার বিভাগীয় প্রধান
কে ছিলেন?
উত্তর: মদিনা সনদের ধারা অনুযায়ী, যেকোনো বিরোধের চূড়ান্ত মীমাংসার জন্য সর্বোচ্চ আইনি ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ ছিলেন আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল মুহাম্মদ
ﷺ।
১৫. মদিনা সনদ কি
আধুনিক সংবিধানের মতো
ধর্মনিরপেক্ষ ছিল?
উত্তর: না,
এটি ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না,
এর মূল ভিত্তি ছিল ঐশ্বরিক নির্দেশনা। তবে এটি আধুনিক ডেমোক্রেসির চেয়েও উন্নত ধর্মীয় সহনশীলতার আদর্শ বুক চিরে দেখিয়েছিল।
১৬. মদিনা সনদে অপরাধীর
শাস্তি কেমন ছিল?
উত্তর: সনদে জাহেলি যুগের গোত্রীয় শাস্তির প্রথা বাতিল করে 'ব্যক্তিগত অপরাধের নীতি'
ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ,
অপরাধের জন্য কেবল অপরাধী নিজেই দায়ী থাকবে, তার গোত্র নয়।
১৭. মদিনা সনদে মক্কার
কুরাইশদের ব্যাপারে কী
নীতি ছিল?
উত্তর: সনদে কঠোরভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, মদিনার কোনো নাগরিক মক্কার কুরাইশ বা তাদের সাহায্যকারীদের কোনো প্রকার আশ্রয় বা সহযোগিতা দিতে পারবে না।
১৮. মদিনা সনদ কেন
বাতিল বা অকার্যকর
হয়েছিল?
উত্তর: মুসলিমরা এই সনদ পুরোপুরি মেনে চললেও মদিনার ইহুদি গোত্রসমূহ
(যেমন: বনু কাইনুকা,
বনু নাযির ও বনু কুরাইযা) একের পর এক ধারা লঙ্ঘন,
বিশ্বাসঘাতকতা এবং কুরাইশদের সাথে গোপন ষড়যন্ত্র করার কারণে এই সনদ পরবর্তীতে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
১৯. মদিনা সনদ থেকে
বর্তমান মুসলিম উম্মাহর
সবচেয়ে বড় শিক্ষা
কী?
উত্তর: পারস্পরিক চুক্তি রক্ষা করা, বহু-ধর্মীয় সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা এবং ইনসাফভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা কায়েম করা।
২০. মদিনা সনদ বাংলা
PDF কোথায় পাওয়া যাবে?
উত্তর: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ বা নির্ভরযোগ্য ইসলামী প্রকাশনীর সীরাত ইবনে হিশাম বা ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহর গ্রন্থের বাংলা অনুবাদে মদিনা সনদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও ধারাগুলোর বাংলা রূপান্তর পড়া যাবে।
উপসংহার
মদিনা সনদ কেবল একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক দলিল নয়,
বরং এটি কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানবজাতির জন্য রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং মানবাধিকার রক্ষার এক জীবন্ত গাইডবুক। মহানবী হযরত মুহাম্মদ
ﷺ আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে যে রাজনৈতিক ও
প্রশাসনিক দূরদর্শিতা দেখিয়েছিলেন, তা আজও আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের গবেষণার খোরাক জোগায়।
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, অনগ্রসর ও গোত্রীয় কোন্দলে লিপ্ত সমাজকে কীভাবে একটি লিখিত দলিলের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল ও আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা যায়—মদিনা সনদ তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। বর্তমান বিশ্বের বুকে শান্তি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে মদিনা সনদের মূলনীতিগুলোর দিকে ফিরে যাওয়া আজ সময়ের দাবি।

0 মন্তব্যসমূহ