ইসলামের ইতিহাসে 'হিজরত' শব্দটির গুরুত্ব অপরিসীম। হিজরত একটি আরবি শব্দ যার অর্থ দেশত্যাগ করা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়া। তবে ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং দ্বীনকে রক্ষা করার লক্ষ্যে মাতৃভূমি ত্যাগ করাকে হিজরত বলা হয়।
নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। এই ঐতিহাসিক যাত্রার
মধ্য দিয়েই অন্ধকারাচ্ছন্ন আরবে আলোর মশাল জ্বলে উঠেছিল। এটি কেবল একটি স্থান পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল আল্লাহর নির্দেশের প্রতি যথাযথ
আনুগত্য প্রদর্শনসহ একটি আদর্শিক,
সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের
সূচনা।
হিজরতের পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মহানবী (সা.) নবুয়ত পাওয়ার পর দীর্ঘ ১৩
বছর মক্কায় তাওহীদের দাওয়াত দেন। কিন্তু কুরাইশ বংশের নেতৃবৃন্দ এবং মক্কার কাফেররা এই দাওয়াতকে মেনে
নিতে পারেনি। বরং চলমান দাওয়াতি
কার্যক্রমকে সমূলে বিনষ্ট করার জন্য তারা
আল্লাহর রাসূল (সা.) এবং তাঁর অনুসারীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে।
মক্কা থেকে মদিনার দূরত্ব প্রায় ৪৫০ কি. মি. হলেও মক্কার এই চরম প্রতিকূল
পরিবেশের মধ্যেই মদিনার কিছু মানুষ মক্কা আগমনের মাধ্যমে রাসুল
স. এর স্বাক্ষাতে আলোর
সন্ধান পান। তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিতে শুরু করে। এটিই মূলত হিজরতের প্রাথমিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
আকাবার শপথ এবং মদিনাবাসীর আমন্ত্রণ
হিজরতের ঠিক এক/দুই বছর
আগে মদিনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) থেকে একদল লোক মক্কায় আসেন। তারা মহানবী (সা.)-এর কাছে গোপনে
ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই ঘটনাগুলো 'আকাবার
প্রথম ও দ্বিতীয় শপথ'
নামে পরিচিত।
রেফারেন্স: (১) আর-রাহীকুল মাখতূম, সফিউর রহমান মোবারকপুরী এবং (২) সিরাতে ইবনে হিশাম, পাতা নম্বর ১১৫ এবং ১১৬।
মদিনাবাসী রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তাদের শহরে
আসার আমন্ত্রণ জানান। তারা প্রতিজ্ঞা করেন যে, নিজেদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে
তারা ইসলামকে রক্ষা করবেন। এই আমন্ত্রণই মক্কা
থেকে মদিনায় হিজরতের পথকে সুগম করে তোলে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার প্রধান কারণসমূহ
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই ঐতিহাসিক
হিজরত কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে ছিল
গভীর সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ঐশ্বরিক কারণ। নিচে কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. কুরাইশদের অমানুষিক নির্যাতন ও অত্যাচার
মক্কায় কাফেরদের অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বাড়ছিল। কোন কোন সাহাবীকে ব্যাপক প্রহার করে
মরুভূমির ফুটন্ত
বালিতে শুইয়ে রেখে বুকের উপর ভারী পাথর চাপিয়ে দেওয়া হতো। আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)-এর মাতা সুমাইয়া
(রা.)-কে নির্মমভাবে শহীদ
করা হয়। এই চরম নির্যাতন
থেকে মুসলমানদের রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছিল।
২. দারুন নদওয়ার ষড়যন্ত্র এবং হত্যার পরিকল্পনা
মদিনায় ইসলাম ছড়িয়ে পড়ছে দেখে কুরাইশরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা দারুন নদওয়ায় এক গোপন বৈঠকে
মিলিত হয়। আবু জাহেলের প্রস্তাবে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে যুবক নিয়ে রাসূল (সা.)-কে একসাথে হত্যা
করা হবে। এতে করে বনু হাশিম গোত্র কারো একার ওপর প্রতিশোধ নিতে পারবে না।
৩. আল্লাহর ঐশ্বরিক নির্দেশ ও ওহী লাভ
কুরাইশরা যখন হত্যার পরিকল্পনা করছিল, ঠিক তখনই আল্লাহ তা’য়ালা হযরত জিবরাইল (আ.) ফেরেশতা এর মাধ্যমে রাসূল (সা.)-কে মক্কা ত্যাগের
নির্দেশ দেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"আর স্মরণ করো, সেই সময়ের যখন কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল তোমাকে বন্দী করার, হত্যা করার বা দেশান্তরিত করার
জন্য।" (সূরা আল-আনফাল:
৩০)
৪. মদিনার অনুকূল পরিবেশ ও রাজনৈতিক শূন্যতা
মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্র
দুটি দীর্ঘকাল ধরে 'বুয়াসের যুদ্ধ'-এ লিপ্ত ছিল।
তারা একজন যোগ্য এবং নিরপেক্ষ নেতার সন্ধান করছিল, যিনি তাদের মধ্যকার বিরোধ মিটিয়ে শান্তি এনে দিতে পারেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার মাধ্যমে মদিনাবাসী সেই কাঙ্ক্ষিত নেতাকে খুঁজে পায়।
হিজরতের মূল ঘটনাপ্রবাহ: এক রোমাঞ্চকর যাত্রা
আল্লাহর নির্দেশ পাওয়ার পর মহানবী (সা.)
হিজরতের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই পুরো সফরটি
ছিল আল্লাহর সাহায্য এবং রাসূল (সা.)-এর নিখুঁত পরিকল্পনার
এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
আলীর (রা.) আত্মত্যাগ এবং আমানত ফেরত
হিজরতের রাতে রাসূল (সা.)-এর বাড়ি কাফেররা
অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর বিছানায় হযরত আলী (রা.)-কে শুয়ে থাকার
নির্দেশ দেন। মক্কাবাসীদের অনেক মূল্যবান আমানত রাসূল (সা.)-এর কাছে গচ্ছিত
ছিল। আলীকে (রা.) সেই আমানতগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নিজের জীবনের পরোয়া না করে হযরত আলী (রা.) রাসূল (সা.)-এর বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েন। আর রাসূল (সা.) আল্লাহর আদেশে কাফেরদের চোখে ধুলো নিক্ষেপ করে সুকৌশলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান।
সাওর পর্বতের গুহায় আশ্রয়
বাড়ি থেকে বের হয়ে মহানবী (সা.) তাঁর পরম বন্ধু হযরত আবু বকর (রা.)-কে সাথে নেন।
তারা মদিনার বিপরীত দিকে অবস্থিত 'সওর' পর্বতের একটি গুহায় আত্মগোপন করেন। সেখানে তারা তিন দিন ও তিন রাত
অবস্থান করেছিলেন।
কুরআনের রেফারেন্স:
কুরাইশরা সন্ধান করতে করতে একদম গুহার মুখে এসে পৌঁছায়। আবু বকর (রা.) তখন অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েছিলেন। এমন সময় রাসুল (স.) হযরত আবুবকর (রা.) কে সাহস দেয়ার জন্য যে কথাটি বলেছিলেন তা আল্লাহ তা'য়ালা কোরআনে কোড করে দিয়েছেন, "যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেররা তাকে বহিস্কার করেছিল এবং তিনি ছিলেন দুজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহর মধ্যে ছিল; তিনি তখন তার সঙ্গীকে বলেছিলেন, বিষন্ন হয়ে না, আল্লাহ তো আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার উপর তার প্রশান্তি নাযিল করেন এবং তাকে শক্তিশালী করেন এমন এক সৈন্যবাহিনী দ্বারা যা তোমরা দেখনি এবং তিনি কাফেরদের কথা হেয় করেন। আর আল্লাহর কথাই সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" (সূরাঃ আত-তাওবা, আয়াত-৪০)।
হাদিসের রেফারেন্স: "নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের মদীনায় হিজরাত" পরিচ্ছেদ-
আবূ বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে গুহায় ছিলাম। আমি আমার মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম এবং লোকের পা দেখতে পেলাম। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! তাদের কেউ নীচের দিকে তাকালেই আমাদের দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবূ বকর! চুপ থাক। আমরা দু’জন আল্লাহ্ হলেন যাদের তৃতীয়। সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩৯২২। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৬৩২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৬৩৫)
সুরাকা ইবনে মালিকের ঘটনা এবং অলৌকিকত্ব
কুরাইশরা ঘোষণা করেছিল যে, যে ব্যক্তি মুহাম্মদ
(সা.)-কে জীবিত বা
মৃত ধরে দিতে পারবে, তাকে ১০০টি লাল উট পুরস্কার দেওয়া
হবে। এই পুরস্কারের লোভে
সুরাকা ইবনে মালিক নামক এক দক্ষ অশ্বারোহী
রাসূল (সা.)-এর সন্ধানে বের
হয়।
সে সওর গুহার পথ ধরে এগোতে
এগোতে একপর্যায়ে রাসূল (সা.) এবং আবু বকর (রা.)-এর খুব কাছাকাছি
চলে আসে। কিন্তু অলৌকিকভাবে তার ঘোড়ার পা বালিতে দেবে
যায়। সুরাকা বুঝতে পারে যে, কোনো অদৃশ্য শক্তি রাসূল (সা.)-কে রক্ষা করছে।
সে ক্ষমা প্রার্থনা করে ফিরে যায় এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর মদিনায় আগমন ও ঐতিহাসিক অভ্যর্থনা
দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর সফর শেষে মহানবী (সা.) মদিনার উপকণ্ঠ 'কুবা' নামক স্থানে পৌঁছান। সেখানে তিনি ইসলাম ইতিহাসের প্রথম মসজিদ 'কুবা মসজিদ' প্রতিষ্ঠা করেন।
এরপর তিনি মদিনা শহরে প্রবেশ করেন। মদিনার আনসাররা (সাহায্যকারী) আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে স্বাগত জানাতে
অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দফ বাজিয়ে গান
গেয়ে উঠছিল:
"ত্বলা আল বাদরু
আলাইনা, মিন সানিয়্যাতিল ওয়াদা..."
(আমাদের ওপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে, ওয়াদা উপত্যকা থেকে...) সম্পূর্ণ গানের ভিডিওটি দেখতে এখানে যান।
মদিনার প্রতিটি মানুষ চাচ্ছিলেন রাসূল (সা.) যেন তাদের বাড়িতে অবস্থান করেন। কিন্তু রাসূল (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর উট 'কাসওয়া'-এর ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেন। উটটি যেখানে গিয়ে বসবে, সেখানেই তিনি অবস্থান করবেন বলে জানান। উটটি হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.)-এর বাড়ির সামনে গিয়ে বসে।
ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও গুরুত্ব
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার এই ঘটনাটি ইসলামের
ইতিহাসে একটি মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায়। এর সামাজিক ও
রাজনৈতিক প্রভাব ছিল ব্যাপক।
১. ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও মদিনার সনদ
মদিনায় আসার পর মহানবী (সা.)
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ইসলামী
রাষ্ট্র গঠন করেন। মদিনায় বসবাসরত মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের
মধ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায়
রাখার জন্য তিনি একটি লিখিত চুক্তি করেন। এটিই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান বা 'মদিনার সনদ' নামে পরিচিত।
২. আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যকার
ভ্রাতৃত্ব (মুয়াখাত)
মক্কা থেকে আসা নিঃস্ব মুহাজিরদের পুনর্বাসনের জন্য রাসূল (সা.) এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
নেন। তিনি একজন মুহাজির ও একজন আনসারকে
ভাই-ভাই বানিয়ে দেন। আনসাররা তাদের সম্পদের অর্ধেক মুহাজির ভাইদের দিয়ে এক অনন্য নজির
স্থাপন করেছিলেন।
৩. হিজরি সনের প্রবর্তন
হিজরতের এই গুরুত্বকে চিরস্মরণীয়
করে রাখার জন্য হযরত উমর (রা.)-এর শাসন আমলে
হিজরতের বছর থেকে ইসলামী পঞ্জিকা বা হিজরি সন গণনা শুরু হয়।
হিজরতের শিক্ষা: বর্তমান জীবনের প্রাসঙ্গিকতা
হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে আধুনিক মুসলিম সমাজের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে:
· পরিকল্পনা
ও কৌশল: আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখার পাশাপাশি বস্তুগত প্রস্তুতি ও নিখুঁত পরিকল্পনা
অপরিহার্য।
· আমানতদারিতা:
শত্রুর আমানতও সঠিক সময়ে ফেরত দেওয়া ইসলামের অন্যতম মূল শিক্ষা।
· ত্যাগ
ও ধৈর্য: সত্যের পথে চলতে গেলে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার
করতেই হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত কোনো সাধারণ স্থান ত্যাগ ছিল না। এটি ছিল কুফর ও জুলুমের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের এক মহিমান্বিত যাত্রা। এই হিজরতের ফলেই ইসলাম মদিনার সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে। ইহা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিজয়ের চিরন্তন প্রতীক।
বদর যুদ্ধের ইতিহাস জানতে এখানে ক্লিক করুন।
-Migration-from-Makkah-to-Madinah.webp)

0 মন্তব্যসমূহ