পবিত্র কুরআনের প্রতিটি আয়াত আজ আমাদের কাছে যেভাবে সংরক্ষিত রয়েছে, তার পেছনে মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ এবং কিছু চমত্কার মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম জড়িয়ে রয়েছে। ইসলামী ইতিহাসে কুরআন সংরক্ষণের এই মহোত্তম অধ্যায়ের কেন্দ্রে যিনি অবস্থান করছেন, তিনি হলেন ওহি লিপিকার সাহাবি হযরত যায়িদ ইবনে সাবিত (রা.)।
তিনি
কেবল
একজন
সাধারণ
সাহাবি
ছিলেন
না,
বরং
তিনি
ছিলেন
মদিনার
আনসারদের মধ্যে
অন্যতম
সেরা
মেধারী,
বহুভাষাবিদ এবং
ইসলামের মহান
আলেম
সাহাবি। আল্লাহর কিতাবকে লিখিত
রূপে
উম্মতের হাতে
পৌঁছে
দেওয়ার
জন্য
তিনি
নিজের
জীবন,
মেধা
ও
শ্রম
উৎসর্গ
করেছিলেন।
এই
নিবন্ধে আমরা
ইসলামের এই
মহান
মনীষীর
জন্ম,
ইসলাম
গ্রহণ,
নবীজি
(সা.)-এর সাথে তাঁর
গভীর
সম্পর্ক, ওহি
লিখন,
ভাষাজ্ঞান এবং
বিশেষ
করে
কুরআন
সংকলনে
তাঁর
ঐতিহাসিক ও
অনবদ্য
অবদান
সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
করব।
হযরত যায়িদ ইবনে সাবিত (রা.) পরিচিতি
হযরত
যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)
ছিলেন
মদিনার
বিখ্যাত খাযরাজ
গোত্রের একজন
উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর
উপনাম
বা
কুনিয়াত ছিল
‘আবু
খারিজাহ’ এবং
‘আবু
সাঈদ’। তবে ইসলামের ইতিহাসে তিনি
‘কুরআনের ওহি
লেখক’
এবং
‘ইলমুল
ফারায়িজ’ বা
উত্তরাধিকার আইনের
সবচেয়ে
বড়
পণ্ডিত
হিসেবে
সমধিক
পরিচিত।
রাসূলুল্লাহ (সা.)
যখন
মদিনায়
হিজরত
করেন,
তখন
যায়িদ
(রা.)
ছিলেন
এগারো
বছরের
এক
কিশোর।
ছোটবেলা থেকেই
তাঁর
তীক্ষ্ণ মেধা
ও
চারিত্রিক মাধুর্য মদিনার
মুসলিম
সমাজের
নজর
কেড়েছিল। তিনি
একাধারে ছিলেন
কিতাব
লেখক,
বিচারক
এবং
ফতোয়া
প্রদানকারী শীর্ষস্থানীয় সাহাবি।
জন্ম, বংশ ও পারিবারিক জীবন
হযরত
যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)
হিজরতের আনুমানিক ১১
বছর
পূর্বে
(৬১১
খ্রিস্টাব্দে) মদিনার
বনু
খাযরাজ
গোত্রের বনু
নাজ্জার শাখায়
জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর
পিতার
নাম
ছিল
সাবিত
ইবনে
যাহহাক
এবং
মাতার
নাম
আল-নাওয়ার বিনতে মালিক।
যায়িদ
(রা.)-এর শৈশবকাল খুব
একটা
মসৃণ
ছিল
না।
ইসলামের আলো
মদিনায়
পৌঁছানোর আগেই,
জাহেলিয়াত যুগের
বিখ্যাত ‘বুয়াসের যুদ্ধে’
তাঁর
পিতা
সাবিত
ইবনে
যাহহাক
নিহত
হন।
মাত্র
ছয়
বছর
বয়সে
এতিম
হওয়া
এই
শিশুটিকে তাঁর
স্নেহময়ী মা
অত্যন্ত যত্ন
সহকারে
লালন-পালন করেন। বনু
নাজ্জার গোত্রটি ছিল
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাতুলালয়, যার
ফলে
পারিবারিক সূত্রেই নবী
পরিবারের প্রতি
তাঁদের
একটি
সহজাত
ভালোবাসা ছিল।
ইসলাম গ্রহণের ঘটনা
মদিনায়
যখন
ইসলামের প্রথম
দাঈ
হযরত
মুসআব
ইবনে
উমাইর
(রা.)
আগমন
করেন,
তখন
তাঁর
মাধ্যমে মদিনার
ঘরে
ঘরে
ইসলামের বাণী
পৌঁছে
যায়।
বনু
নাজ্জার গোত্রের সাথে
সাথে
বালক
যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)
এবং
তাঁর
পরিবার
অত্যন্ত আগ্রহের সাথে
ইসলাম
গ্রহণ
করেন।
তখন
তাঁর
বয়স
ছিল
মাত্র
১০
বা
১১
বছর।
তিনি
মক্কায়
গিয়ে
সরাসরি
নবীজি
(সা.)-এর হাতে বায়াত
হওয়ার
সুযোগ
পাননি।
তবে
রাসূলুল্লাহ (সা.)
যখন
মদিনায়
ঐতিহাসিক হিজরত
সম্পন্ন করেন,
তখন
যায়িদ
(রা.)
ছিলেন
প্রথম
সারির
সেই
আনন্দিত শিশুদের একজন,
যারা
নবীজিকে স্বাগত
জানিয়েছিল। অল্প
বয়সেই
ইসলাম
গ্রহণ
করার
কারণে
তাঁর
পুরো
চেতনা
জুড়ে
ছিল
ইসলামের সুমহান
আদর্শ।
নবীজি (সা.) এর নিকটবর্তী হওয়ার ইতিহাস
রাসূলুল্লাহ (সা.)
মদিনায়
আসার
পর
থেকেই
কিশোর
যায়িদ
(রা.)
তাঁর
সান্নিধ্যে থাকার
জন্য
ব্যাকুল ছিলেন।
হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে
যখন
ঐতিহাসিক বদর
যুদ্ধ
সংঘটিত
হয়,
তখন
মাত্র
১৩
বছরের
কিশোর
যায়িদ
তরবারি
হাতে
নবীজি
(সা.)-এর দরবারে হাজির
হন।
সীরাতগ্রন্থের বিবরণ: সীরাতে ইবনে
হিশামে
বর্ণিত
হয়েছে,
নবীজি
(সা.)
যায়িদ
(রা.)-এর অল্প বয়স
এবং
শারীরিক দুর্বলতা দেখে
অত্যন্ত মৃদু
হেসে
তাঁকে
যুদ্ধে
অংশ
নেওয়ার
অনুমতি
না
দিয়ে
পরম
স্নেহে
ঘরে
ফেরত
পাঠান।
যুদ্ধে
যেতে
না
পেরে
যায়িদ
(রা.)
অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ন হন।
তবে
তিনি
দমে
যাননি।
তরবারি
চালনার
চেয়ে
তিনি
তাঁর
কলম
ও
মেধাকে
আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত করার
সিদ্ধান্ত নেন।
তাঁর
মা
আল-নাওয়ার বিনতে মালিক নবীজি
(সা.)-এর কাছে গিয়ে
বলেন,
“হে
আল্লাহর রাসূল!
আমাদের
এই
সন্তানটি খুবই
মেধাবী,
সে
ইতিমধ্যেই কুরআনের ১৭টি
সূরা
মুখস্থ
করেছে।”
নবীজি
(সা.)
যায়িদের এই
মেধার
পরীক্ষা নেন
এবং
তাঁর
বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শুনে
অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন।
এরপর
থেকেই
নবীজি
(সা.)-এর মজলিসে তাঁর
নিয়মিত
যাতায়াত শুরু
হয়।
ওহি লিপিকার হিসেবে দায়িত্ব
মেধা,
বিশ্বস্ততা এবং
আমানতদারিতার কারণে
হযরত
যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)
দ্রুতই
নবীজি
(সা.)-এর অন্যতম প্রধান
ওহি
লিপিকার বা
সেক্রেটারি হিসেবে
নিযুক্ত হন।
যখনই
কোনো
আয়াত
নাজিল
হতো,
নবীজি
(সা.)
প্রায়শই যায়িদ
(রা.)-কে ডেকে পাঠাতেন।
নবীজি (সা.) বলতেন: "যায়িদকে
ডাকো এবং সে যেন দোয়াত, কলম ও চামড়া বা হাড় নিয়ে আসে।"(সহিহ বুখারি, হাদিস নং
৪৯৫৪)
তিনি
অত্যন্ত নিখুঁত
ও
সতর্কতার সাথে
চামড়া,
খেজুরের ডাল,
পাথরখণ্ড ও
পশুর
হাড়ে
ওহি
লিখে
রাখতেন। ওহি
লেখা
শেষ
হলে
নবীজি
(সা.)
তাঁকে
তা
পড়ে
শোনানোর নির্দেশ দিতেন।
যদি
কোনো
ভুলত্রুটি হতো,
নবীজি
তা
সংশোধন
করে
দিতেন।
এভাবে
কুরআনের মূল
অনুলিপি তৈরিতে
তিনি
সরাসরি
নবীজির
তত্ত্বাবধানে কাজ
করার
বিরল
সৌভাগ্য লাভ
করেন।
হযরত যায়িদ (রা.) এর ভাষাজ্ঞান ও মেধা
হযরত
যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)-এর মেধা ছিল
অলৌকিক
পর্যায়ের। মদিনার
ইসলামী
রাষ্ট্রের প্রসারের সাথে
সাথে
ইহুদি
ও
অন্যান্য বিদেশি
শক্তির
সাথে
যোগাযোগের জন্য
একটি
বিশ্বস্ত ও
দক্ষ
দোভাষীর প্রয়োজন দেখা
দেয়।
নবীজি
(সা.)
যায়িদ
(রা.)-এর ওপর এই
গুরুদায়িত্ব অর্পণ
করেন।
হাদিসের উদ্ধৃতি: হযরত যায়িদ
(রা.)
বর্ণনা
করেন,
রাসূলুল্লাহ (সা.)
আমাকে
বললেন,
"আমার
কাছে
ইহুদিদের পক্ষ
থেকে
অনেক
চিঠি
আসে,
কিন্তু
আমি
তাদের
বিশ্বাস করি
না।
তুমি
কি
হিব্রু
ভাষা
শিখতে
পারবে?"
যায়িদ
(রা.)
বলেন,
"আমি
মাত্র
১৫
দিনের
মধ্যে
হিব্রু
ভাষা
এবং
অন্য
বর্ণনামতে সিরিয়াক (সিরিয়ানি) ভাষা
আয়ত্ত
করে
ফেলি।"
(জামে
আত-তিরমিযী, হাদিস নং ২৭১৫)।
এই
অবিশ্বাস্য ভাষাজ্ঞানের কারণে
তিনি
মদিনা
রাষ্ট্রের প্রধান
কূটনৈতিক বা
সেক্রেটারি হিসেবে
আত্মপ্রকাশ করেন।
তিনি
ইহুদিদের চিঠির
অনুবাদ
করতেন
এবং
নবীজি
(সা.)-এর পক্ষ থেকে
হিব্রু
ও
সিরিয়াক ভাষায়
উত্তর
লিখে
দিতেন।
কুরআন সংকলনে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা
পবিত্র
কুরআনের সংরক্ষণ ইতিহাসে হযরত
যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)-এর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা
থাকবে।
তিনি
নবীজি
(সা.)-এর জীবদ্দশায় সম্পূর্ণ কুরআন
মুখস্থ
করেছিলেন এবং
রাসূলের ওফাতের
আগে
জিবরাইল (আ.)-এর সাথে কুরআনের যে
শেষ
পুনরাবৃত্তি (আরদাহ
আখিরাহ)
হয়েছিল,
তাতেও
তিনি
উপস্থিত ছিলেন।
এই
গভীর
অভিজ্ঞতার কারণেই
খিলাফত
আমলে
তাঁকে
কুরআন
সংকলনের প্রধান
স্থপতি
বানানো
হয়।
আবু বকর (রা.) এর আমলে কুরআন সংকলন
হিজরি
১২
সনে
ইয়ামামার যুদ্ধে
যখন
বহুসংখ্যক হাফেজে
কুরআন
সাহাবি
শাহাদাত বরণ
করেন,
তখন
হযরত
উমর
(রা.)
অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে
পড়েন।
তিনি
প্রথম
খলিফা
হযরত
আবু
বকর
(রা.)-এর কাছে গিয়ে
কুরআনকে একটি
কিতাব
আকারে
সংকলন
করার
পরামর্শ দেন।
দীর্ঘ
আলোচনার পর
আবু
বকর
(রা.)
এই
ঐতিহাসিক কাজের
জন্য
যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)-কে মনোনীত করেন।
হযরত আবু
বকর (রা.) যায়িদকে
ডেকে বলেন: "তুমি একজন
বুদ্ধিমান
যুবক, তোমার ব্যাপারে
আমাদের কোনো সন্দেহ
নেই। তুমি আল্লাহর
রাসূলের
ওহি লিখতে। অতএব,
তুমি কুরআনের আয়াতগুলো সন্ধান করো
এবং তা এক
জায়গায় সংকলন করো।"(সহিহ বুখারি,
হাদিস নং ৪৬৭৯)
যায়িদ (রা.)-এর কঠোর সংকলন পদ্ধতি:
যায়িদ
(রা.)
এই
দায়িত্ব পেয়ে
বলেছিলেন, "আল্লাহর কসম,
তারা
যদি
আমাকে
একটি
পাহাড়
স্থানান্তরের দায়িত্ব দিত,
তবে
তাও
আমার
কাছে
কুরআনের এই
সংকলন
কাজের
চেয়ে
সহজ
মনে
হতো।"
তিনি
অত্যন্ত কঠোর
ও
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
অবলম্বন করেছিলেন: ১.
প্রতিটি আয়াতের
জন্য
অন্তত
দুজন
সাক্ষীর মৌখিক
সাক্ষ্য নিতে
হতো,
যারা
স্বয়ং
নবীজির
সামনে
তা
লিখেছেন। ২.
সাহাবিদের ব্যক্তিগতভাবে মুখস্থ
থাকার
বিষয়টি
যাচাই
করা
হতো।
৩.
লিখিত
স্ক্রিপ্ট ও
মানুষের স্মৃতির মাঝে
শতভাগ
মিল
নিশ্চিত করা
হতো।
এই
কঠোর
স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে তিনি
পবিত্র
কুরআনের প্রথম
অফিশিয়াল পূর্ণাঙ্গ কপি
প্রস্তুত করেন,
যা
'সহিফা'
নামে
পরিচিত
এবং
এটি
উমর
(রা.)-এর মাধ্যমে পরবর্তীতে হাফসা
(রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল।
উসমান (রা.) এর আমলে কুরআনের মানক কপি প্রস্তুত
ইসলামী
সাম্রাজ্য যখন
পারস্য,
সিরিয়া
ও
আর্মেনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হলো,
তখন
নতুন
মুসলিমদের মধ্যে
কুরআনের কিরাআত
বা
উচ্চারণরীতি নিয়ে
কিছুটা
মতপার্থক্য দেখা
দিল।
এই
গুরুতর
পরিস্থিতিতে তৃতীয়
খলিফা
হযরত
উসমান
(রা.)
হিজরি
২৫
সনে
একটি
উচ্চপর্যায়ের কমিটি
গঠন
করেন।
এই
কমিটির
প্রধান
হিসেবে
আবারও
দায়িত্ব দেওয়া
হয়
হযরত
যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)-কে। তাঁর সাথে
কুরাইশ
বংশের
আরও
তিনজন
সাহাবিকে (আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর, সাঈদ ইবনুল আস এবং আব্দুর রহমান ইবনে হারিস) যুক্ত
করা
হয়।
- মূল
উৎস ব্যবহার: হাফসা (রা.)-এর কাছে রক্ষিত প্রথম সংকলনটি এনে তার ওপর ভিত্তি করে কুরাইশদের
বিশুদ্ধ উপভাষায় (Dialect) কুরআনের সাতটি প্রমাণ্য কপি বা মুসহাফ তৈরি করা হয়।
- আঞ্চলিক
বিতরণ: এই কপিগুলো মক্কা, কুফা, বসরা, দামেস্ক এবং মদিনায় পাঠানো হয় এবং বাকি সব ব্যক্তিগত
অসম্পূর্ণ খাতা পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই
ঐতিহাসিক অবদানের কারণেই
আজ
আমরা
পৃথিবীর সব
প্রান্তে হুবহু
একই
বানানের যে
কুরআন
দেখতে
পাই,
তাকে
‘মুসহাফে উসমানী’ বলা হয়,
যার
প্রধান
লেখক
ছিলেন
যায়িদ
(রা.)।
হাদিস, ফিকহ ও ইলমে তাঁর অবদান
কুরআন
সংকলনের পাশাপাশি হযরত
যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)
ছিলেন
মদিনার
অন্যতম
শীর্ষ
ফকিহ
বা
আইনবিদ। বিশেষ
করে
'ইলমুল
ফারায়িজ' বা
ইসলামি
উত্তরাধিকার আইনে
তিনি
ছিলেন
অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
নবীজি (সা.)-এর সুসংবাদ: রাসূলুল্লাহ (সা.)
ইরশাদ
করেছেন,
"আমার
উম্মতের মধ্যে
উত্তরাধিকার আইন
বা
ফারায়িজ সম্পর্কে সবচেয়ে
বেশি
জ্ঞানী
হলেন
যায়িদ
ইবনে
সাবিত।"
(জামে
আত-তিরমিযী)
খলিফা
উমর
(রা.)
এবং
উসমান
(রা.)
যখনই
মদিনার
বাইরে
যেতেন,
যায়িদ
(রা.)-কে মদিনার ভারপ্রাপ্ত খলিফা
বা
প্রধান
বিচারপতির দায়িত্ব দিয়ে
যেতেন।
তিনি
মদিনার
প্রধান
ফতোয়া
বোর্ডের প্রধান
ছিলেন।
তৎকালীন বড়
বড়
সাহাবি
যেমন
ইবনে
আব্বাস
(রা.)
ও
ইবনে
উমর
(রা.)
জটিল
আইনি
বিষয়ে
তাঁর
শরণাপন্ন হতেন।
তিনি
নবীজি
(সা.)
থেকে
সরাসরি
৯২টি হাদিস বর্ণনা
করেছেন,
যা
বুখারি
ও
মুসলিম
শরিফে
সংকলিত
হয়েছে।
তাঁর চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব
হযরত
যায়িদ
(রা.)
ছিলেন
অত্যন্ত বিনয়ী,
খোদাভীরু এবং
উম্মতের প্রতি
দরদি
একজন
মানুষ।
জ্ঞান
ও
সম্মানের দিক
থেকে
অনেক
উচ্চে
অবস্থান করলেও
তিনি
সাহাবিদের প্রতি
গভীর
শ্রদ্ধা রাখতেন।
একবার
প্রখ্যাত মুফাসসির হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)-এর সওয়ারির লাগাম
ধরে
টেনে
নিয়ে
যাচ্ছিলেন। যায়িদ
(রা.)
লজ্জিত
হয়ে
বললেন,
"হে
আল্লাহর রাসূলের চাচাতো
ভাই!
আপনি
হাত
সরান,
এমন
করবেন
না।"
ইবনে
আব্বাস
(রা.)
উত্তর
দিলেন,
"আমাদের আলেম ও বড়দের সম্মানার্থে এভাবেই করার নির্দেশ আমাদের দেওয়া হয়েছে।"
জবাবে
যায়িদ
(রা.)
ইবনে
আব্বাসের হাতটি
টেনে
নিয়ে
চুম্বন
করলেন
এবং
বললেন,
"রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবারের সাথে এমন আচরণ করার জন্যই আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।" (আল-মুস্তাদরাক আলাস সাহিহাইন)।
আরো পড়ুন: ইসলামে শিক্ষকের মর্যাদা
উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও শিক্ষণীয় কাহিনি
যায়িদ
(রা.)-এর জীবন থেকে
একটি
বিখ্যাত ঘটনা
ইসলামের ইতিহাসে মেধার
মূল্যায়নের দারুণ
এক
উদাহরণ
হিসেবে
গণ্য
করা
হয়।
বদর
যুদ্ধের পর
যে
সমস্ত
কাফের
বন্দি
অর্থ
দিয়ে
মুক্তি
পেতে
অক্ষম
ছিল,
নবীজি
(সা.)
তাদের
জন্য
একটি
অনন্য
শর্ত
দেন।
শর্তটি
ছিল—প্রত্যেক বন্দি মদিনার ১০টি
শিশুকে
লিখতে
ও
পড়তে
শেখাবে। এই
বন্দিদের কাছ
থেকেই
কিশোর
যায়িদ
(রা.)
আরবি
লিপি
বা
লেখার
নিখুঁত
কৌশল
শিখেছিলেন। একটি
অমুসলিম বন্দি
শিবিরের জ্ঞানকে কাজে
লাগিয়ে
কীভাবে
ইসলামের সবচেয়ে
বড়
খেদমত
(ওহি
লিখন)
করা
যায়,
যায়িদ
(রা.)-এর জীবন তার
সবচেয়ে
বড়
প্রমাণ।
তাঁর মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
হযরত
যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)
আনুমানিক ৪৫
হিজরি
(৬৬৫
খ্রিস্টাব্দ) বা
কেউ
কেউ
বলেন
৫৪
হিজরি
বা
৫৬
হিজরিতে মদিনা
মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন।
তাঁর
জানাজার নামাজ
পড়ান
তৎকালীন মদিনার
গভর্নর
মারওয়ান ইবনুল
হাকাম।
তাঁকে
মদিনার
বিখ্যাত জান্নাতুল বাকি
কবরস্তানে দাফন করা
হয়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে জান্নাতুল বাকির ইতিহাস
পড়ুন।
তাঁর
মৃত্যুতে মদিনার
আকাশ-বাতাস শোকাতুর হয়ে
পড়েছিল। ইসলামের মহান
পণ্ডিত
হযরত
আব্দুল্লাহ ইবনে
আব্বাস
(রা.)
তাঁর
দাফন
শেষে
বলেছিলেন:
"আজকে ইসলামের বিপুল
পরিমাণ
ইলম
বা
জ্ঞান
মাটির
নিচে
দাফন
হয়ে
গেল।
কেউ
যদি
জানতে
চায়
জ্ঞান
কীভাবে
চলে
যায়,
সে
যেন
দেখে
নেয়—এভাবেই জ্ঞান চলে
যায়।"
(তবকাতে
ইবনে
সাদ)
তাঁর মৃত্যুতে বিশিষ্ট সাহাবি
হযরত
আবু
হুরায়রা (রা.)
মন্তব্য করেছিলেন, "আজ এই উম্মতের শ্রেষ্ঠতম আলেম বিদায় নিলেন।"
বর্তমান মুসলিমদের জন্য শিক্ষা
হযরত যায়িদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত কিন্তু গৌরবময় জীবন থেকে বর্তমান মুসলিম উম্মাহ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে:
|
মেধার সঠিক ব্যবহার: কিশোর বয়সের চপলতাকে বাদ দিয়ে কীভাবে মেধাকে দ্বীন ও
মানবতার কল্যাণে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা
যায়,
তা
যায়িদ (রা.)
শিখিয়েছেন। |
|
জ্ঞান অন্বেষণে নিষ্ঠা: মাত্র ১৫ দিনে একটি
বিদেশি ভাষা
আয়ত্ত করার
ঘটনা
প্রমাণ করে
যে,
একাগ্রতা থাকলে যেকোনো কঠিন
জ্ঞান অর্জন সম্ভব। |
|
শ্রম ও নিখুঁত কর্মদক্ষতা: কুরআন সংকলনের মতো জটিল কাজে
তাঁর
সততা,
নিখুঁত কর্মপদ্ধতি ও
কঠোর
পরিশ্রম আমাদের কর্মক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের শিক্ষা দেয়। |
|
আলেম ও কোরআনের প্রতি ভালোবাসা: কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করাই
মানুষের ইহকালীন ও
পরকালীন সম্মানের একমাত্র চাবিকাঠি। |
FAQ
(প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী)
১. হযরত যায়িদ ইবনে সাবিত (রা.) কে ছিলেন?
উত্তর: হযরত যায়িদ
ইবনে
সাবিত
(রা.)
ছিলেন
মদিনার
আনসার
গোত্রের একজন
প্রখ্যাত সাহাবি,
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান ওহি
লিপিকার এবং
ইসলামের ইতিহাসের প্রথম
কুরআন
সংকলন
কমিটির
প্রধান।
২. তিনি কেন বিখ্যাত হয়ে আছেন?
উত্তর: তিনি প্রথম
খলিফা
আবু
বকর
(রা.)
এবং
তৃতীয়
খলিফা
উসমান
(রা.)-এর আমলে পবিত্র
কুরআনের বিচ্ছিন্ন অংশগুলোকে একত্রিত করে
গ্রন্থ
আকারে
সংকলন
ও
সংরক্ষণের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের
জন্য
বিখ্যাত।
৩. কুরআন সংকলনে তাঁর ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: তিনি সাহাবিদের মুখস্থ
স্মৃতি
এবং
লিখিত
চামড়া-পাথর পরীক্ষা করে
অত্যন্ত কঠোর
বৈজ্ঞানিক নিয়মে
প্রথম
ওহি
সংকলন
করেন।
উসমান
(রা.)-এর আমলে তিনি
মূল
'মুসহাফে উসমানী'
তৈরির
কমিটির
নেতৃত্ব দেন।
৪. তিনি কতটি ভাষা জানতেন?
উত্তর: তিনি তাঁর
মাতৃভাষা আরবি
ছাড়াও
নবীজি
(সা.)-এর নির্দেশে অত্যন্ত অল্প
সময়ে
হিব্রু
এবং
সিরিয়াক (সিরিয়ানি) ভাষা
আয়ত্ত
করেছিলেন।
৫. তিনি কোন গোত্রের লোক ছিলেন?
উত্তর: তিনি মদিনার
বিখ্যাত খাযরাজ
গোত্রের 'বনু
নাজ্জার' শাখার
সন্তান
ছিলেন,
যা
ছিল
মূলত
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাতুলালয়ের বংশ।
৬. তাঁর মৃত্যু কবে এবং কোথায় হয়?
উত্তর: তিনি আনুমানিক ৪৫
হিজরি
(৬৬৫
খ্রিস্টাব্দ) বা
তার
কিছু
পরে
মদিনা
মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন
এবং
তাঁকে
জান্নাতুল বাকিতে
দাফন
করা
হয়।
৭. তিনি মোট কতটি হাদিস বর্ণনা করেছেন?
উত্তর: তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)
থেকে
সরাসরি
৯২টি
হাদিস
বর্ণনা
করেছেন,
যা
সহিহ
বুখারি
ও
মুসলিমসহ প্রধান
প্রধান
হাদিস
গ্রন্থে স্থান
পেয়েছে।
৮. উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়িজে তাঁর স্থান কেমন ছিল?
উত্তর: তিনি ছিলেন
সাহাবিদের মধ্যে
উত্তরাধিকার আইনের
সবচেয়ে
বড়
পণ্ডিত। স্বয়ং
নবীজি
(সা.)
তাঁকে
উম্মতের মধ্যে
সবচেয়ে
বড়
ফারায়িজের জ্ঞানে
দক্ষ
বলে
প্রত্যয়ন করেছিলেন।
৯. তিনি কেন বদর যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি?
উত্তর: বদর যুদ্ধের সময়
তাঁর
বয়স
ছিল
মাত্র
১৩
বছর।
অতি
অল্প
বয়স
এবং
শারীরিক দুর্বলতার কারণে
নবীজি
(সা.)
স্নেহের সাথে
তাঁকে
যুদ্ধ
থেকে
ফেরত
পাঠান।
১০. ওহি লিখন ছাড়া তিনি রাষ্ট্রে আর কী দায়িত্ব পালন করতেন?
উত্তর: তিনি মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান কূটনৈতিক বা সেক্রেটারি, প্রধান ফতোয়া প্রদানকারী ফকিহ এবং খলিফাদের অনুপস্থিতিতে মদিনার ভারপ্রাপ্ত খলিফা ও বিচারপতির দায়িত্ব পালন করতেন।
হযরত যায়িদ ইবনে সাবিত (রা.) সম্পর্কে আরো জানুন Wikipedia থেকে।

0 মন্তব্যসমূহ